আবারও উত্তপ্ত নেপাল। সম্প্রতি ঐদেশজুড়ে চলা GenZ বিক্ষোভের জেরে টালমাটাল গোটা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ফলস্বরপ তড়িঘড়ি পদত্যাগ করে, দেশ ছেড়ে পালান প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। সেইসঙ্গে, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি সহ প্রশাসনিক ভবনগুলিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রীদেরও রাস্তার ফেলে মারধর করে আন্দোলনকারীরা। তবে, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে নেপালের রাজনৈতিক অবস্থান কখনোই শান্ত ছিল না। ওদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো যখনই দুর্বল হয়েছে, ততবারই দেশজুড়ে এক নতুন আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
নেপালের জনগণ বারবার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। এর শুরুটা হয়েছিল ১৯৫১ সালে, যখন প্রথম গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে রানা শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজাকে সক্রিয় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু এরপরও সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য সংগ্রাম চলতে থাকে। ১৯৫৩ সালে কৃষক নেতা ভীম দত্ত পন্তকে হত্যা করা হয়। জানা যায়, তিনি জমির অধিকারের জন্য লড়াই করছিলেন। ১৯৯৮ সালে সংসদ সদস্য মির্জা দিলশাদ বেগম রাজনৈতিক কারণে এবং অপরাধ জগতের সংশ্লিষ্টতায় খুন হন। পরবর্তীতে, ১৯৯৬ নেপালে মাওবাদী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা দীর্ঘ ১০ বছর চলেছিল। এই যুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, ফলে ঐসময় নেপাল একপ্রকার নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল।
নেপালের ইতিহাসে প্রথম বড় গণআন্দোলন ঘটেছিল ১৯৯০ সালে। এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ রাজা বীরেন্দ্র সাংবিধানিক রাজতন্ত্র মেনে নিতে বাধ্য হন। কিন্তু এরপরও, জনগণের প্রতি শাসকদলের অবহেলা না কমায়, অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ২০০১ সালে পুত্র দীপেন্দ্রর হাতে রাজা বীরেন্দ্র সপরিবারে হত্যা হওয়ার পর রাজা জ্ঞানেন্দ্র ক্ষমতায় আসেন, কিন্তু তার শাসনকালেও জনগণ আশানুরূপ ফল পাননি। এর ফলে, ২০০৬ সালে নেপালে দ্বিতীয় বড় গণআন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের চাপে রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়।
তবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরও পায়নি নেপালবাসী শান্তি। নেপালের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণও বেকারত্ব, শিক্ষা, চিকিৎসা পরিষেবা থেকে শুরু করে দুর্বল অর্থনীতি, লাগামহীন দুর্নীতিই মূলত দায়ী। নেপালের মানুষজন, বিশেষ করে নেপালের তরুণ প্রজন্ম কোনোদিনই দ্বিচারিতা মেনে নেননি। এর ফলস্বরুপ ওদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে রাজতন্ত্রের পতন, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, মাওবাদী গৃহযুদ্ধের মতো বড় বড় ঘটনাও যেমন ঘটেছে, তেমনি ঘটছে বর্তমানের GenZ আন্দোলন।
এবার প্রশ্ন জাগছে, এই নতুন আন্দোলনের ফলে কি ওদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে? নাকি ভবিষ্যতে নেপাল আবারও কোনো নতুন বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাবে?
-দিশা দাস