দেশের ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনার জগতে সুপরিচিত নাম সজল রায়। তাঁর সংস্থা 'অঞ্জলি ইনভেস্টমেন্ট' গত ২৮ বছর ধরে পার্সোনাল ফিনান্স এবং ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইসারির ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সজল রায় ভারতের আর্থিক সিস্টেম, ফিনান্সিয়াল সেভিংস, এবং আগামী দশকের ইনভেস্টমেন্ট প্রবণতা নিয়ে বিশদে মত প্রকাশ করেছেন।
সঞ্চয় থেকে বিনিয়োগে রূপান্তর: এক নতুন ভারত
সজল রায় জানান, "বর্তমানে ভারত ১৫০ কোটির দেশ। একসময় আমরা 'ন্যাশন অফ সেভারস' ছিলাম। ব্যাঙ্কে সেভিংস অ্যাকাউন্ট, পোস্ট অফিস স্কিম, ফিক্সড ডিপোজিটে টাকা রাখতাম। কিন্তু এখন আমরা 'ন্যাশন অফ ইনভেস্টরস'-এর পথে এগোচ্ছি।"
গত এক দশকে মিউচুয়াল ফান্ড, স্টক মার্কেট, SIP ইত্যাদির প্রসার সাধারণ মানুষকে সেভিংস থেকে বিনিয়োগমুখী করেছে। বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী সময়ে যখন মানুষ ঘরে বসে অনলাইন মাধ্যমে মানি ম্যানেজমেন্ট করতে শিখল, তারপর থেকে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হতে শুরু হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, "ইনভেস্টমেন্ট মানেই সবসময় লাভ হবে না। মিডিয়ার অতিরিক্ত হাইপ বা সোশ্যাল মিডিয়ার ভুল গাইডেন্স অনেক নতুন ইনভেস্টরকে বিভ্রান্ত করে।"
ফিউচারস ও অপশনস-এর ফাঁদে ৯৩% ক্ষতিগ্রস্ত:
সজল রায় SEBI-এর তথ্য উদ্ধৃত করে জানান, বর্তমানে ফিউচারস অ্যান্ড অপশনস (F\&O) ট্রেডিং-এ ৯৩% মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই ৭% লাভকারী মূলত বড় বড় ইনস্টিটিউশনাল প্লেয়ার বা অভিজ্ঞ ট্রেডার।
তিনি বলেন, "লোকে ভাবে রাতারাতি ধনী হওয়া যাবে। কিন্তু এতে ক্ষতি হয়, আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়, এবং অনেকে দীর্ঘ সময় ধরে আর বাজারে ফিরতেই পারেন না।"
সজল রায় -এর মতে বাজারে তিন রকমের বিনিয়োগকারী রয়েছে:
১. কনজারভেটিভ: যারা ঝুঁকি নিতে চান না এবং স্থিতিশীল আয় চান।
২. মডারেট: ঝুঁকি এবং রিটার্নের মাঝে ভারসাম্য খোঁজেন।
৩. অ্যাগ্রেসিভ: উচ্চ রিটার্নের আশায় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
এদের মধ্যে প্রতিটি বিনিয়োগকারীর জন্যই ভিন্ন ভিন্ন অ্যাসেট অ্যালোকেশন প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—
i) ব্যাঙ্ক বা লিকুইড ফান্ডে কিছু টাকা রাখা (জরুরি অবস্থার জন্য)
ii) হাইব্রিড ফান্ডে ধাপে ধাপে প্রবেশ
iii) লং-টার্ম ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট
iv) মিউচুয়াল ফান্ড SIP-এ নিয়মিত বিনিয়োগ
রিটার্ন বনাম ইনফ্লেশন: প্রকৃত লাভ কতটা?
সজল রায় জানান,"ব্যাংকে ৭% সুদ পাওয়া মানেই লাভ নয়, যদি ইনফ্লেশনও ৭% হয়, তাহলে প্রকৃত রিটার্ন কিন্তু শূন্য। উপরন্তু, ট্যাক্স দিলে আরও লোকসান হয়।"
সঠিক পরামর্শই ভবিষ্যৎ গঠনের চাবিকাঠি:
একজন অ্যাডভাইজার ও ইনভেস্টরের সম্পর্ককে সজল রায় তুলনা করেন ডাক্তার-রোগীর সঙ্গে। ওনার মতে, "ডাক্তার যেমন রোগ বুঝে প্রেসক্রিপশন দেন, তেমনি বিনিয়োগও হতে হবে ব্যক্তিগত চাহিদা, বয়স, লক্ষ্য, ঝুঁকির মানসিকতা বুঝে।"
একজন ইনভেস্টরের জীবনে দুটি পর্যায় থাকে:
১. Accumulate Phase (সম্পদ গঠন)
২. Distribution Phase (সম্পদ থেকে আয়)
এই দুই পর্যায়ের মধ্যে, বেশীরভাগই থাকেসন্তানের পড়াশোনা, বাড়ি কেনা, অবসর ইত্যাদি। তাই একজন অ্যাডভাইজারের দায়িত্ব হল বিনিয়োগকারীকে এই যাত্রায় হাত ধরে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া।"
সজল রায়ের পরামর্শ অনুযায়ী, কিছু ভালো বিনিয়োগ অভ্যাস:
* বিনিয়োগ শুরু করুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
* শুধু রিটার্ন নয়, রিস্ক ও ইনফ্লেশনের দিকটাও দেখুন।
* নিজের রিস্ক প্রোফাইল জানুন এবং অ্যাসেট অ্যালোকেশন ঠিক রাখুন।
* মিডিয়া বা হাইপে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
* নিয়মিত রিভিউ করুন আপনার পোর্টফোলিও।
* অভিজ্ঞ ও বিশ্বাসযোগ্য অ্যাডভাইজারের সাহায্য নিন।
এর মধ্যে দিয়ে সজল রায় আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন, ভারতীয় আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের গতি দ্রুত। কিন্তু এই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে চাই সঠিক পরিকল্পনা, অধ্যবসায় এবং সঠিক দিকনির্দেশনা। বিনিয়োগ শুধুমাত্র টাকা রিটার্নের খেলা নয় এটি হল স্বপ্ন ও নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ।
- দিশা দাস