সামনেই উৎসবের মরশুম। কিন্তু তার ঠিক আগেই দেশে কি ফের নেমে আসতে চলেছে বেনজির বিদ্যুৎ সংকটের কালো ছায়া? অন্তত দেশের বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির সাম্প্রতিক চিত্র তেমনই অশনিসংকেত দিচ্ছে।
দেশের বৃহত্তম ৫০টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার নিরাপত্তা-মজুত নির্ধারিত সীমার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, বর্তমান মজুত দিয়ে আর মাত্র ৯ দিনের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। চার বছর আগে, অর্থাৎ ২০২২ সালে শেষবার দেশের যোগানব্যবস্থায় এমন ধাক্কা এসেছিল। উৎসবের মুখে ফের সেই স্মৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে দেশজুড়ে অন্ধকারের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন বাঙালীর বাংলায় নিরাপদ নন বিদ্যাসাগর! কী হলো মূর্তির পরিনতি?
শক্তি খাতের এই সংকটের নেপথ্যে মূলত একটি দ্বিমুখী ধাক্কা কাজ করছে। প্রথমত, আগস্ট মাসের রেকর্ড ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়ার কারণে দেশজুড়ে হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা আকাশ ছোঁয়। সেপ্টেম্বরের উৎসবের মরশুমে এই চাহিদা আরও কয়েক গুণ বাড়ার স্বাভাবিক পূর্বাভাস রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ঠিক এই সময়েই দ্বিতীয় ধাক্কাটা দিয়েছে বর্ষা। অতিবৃষ্টির দরুন খনিগুলিতে জল জমে কয়লা উত্তোলন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, আবার অন্যদিকে রেলপথেও পরিবহন ধীর হয়ে পড়ে সরবরাহ থমকে গেছে। আমাদের দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই মেটায় কয়লা ভিত্তিক কেন্দ্রগুলি। ফলে এই সরবরাহ শৃঙ্খল সামান্য বিঘ্নিত হতেই পাওয়ার প্ল্যান্টগুলির মজুত দ্রুত খালি হতে শুরু করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতেই দেশের শীর্ষ ৫০টি বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বর্তমানে মাত্র ২৮.২ মিলিয়ন টন কয়লা অবশিষ্ট রয়েছে। অথচ কেন্দ্র নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী এই সময়ে অন্তত ৫৮.৭ শতাংশ (বা প্রায় সমপরিমাণ বাফার স্টক) কয়লা জমা থাকার কথা ছিল। বাস্তবে সেই জায়গায় হাতে রয়েছে নির্ধারিত সীমার মাত্র ৪৮ শতাংশ কয়লা। নতুন কোনো সরবরাহ যদি সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে যায়, তবে এই জমানো রসদে বড়জোর ৯ দিন প্ল্যান্টগুলি চালানো যাবে। হাতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা-মজুত বা বাফার স্টক না থাকা মানে, খনি বা রেল লাইনে যেকোনো ছোটখাটো বিভ্রাটও উৎসবের দিনগুলোতে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া।
তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ দেখছে না কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক। তাদের দাবি, পরিস্থিতি আপাতত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিকরা জানিয়েছেন, সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। সার্বিক অবস্থা সামাল দিতে একটি বিশেষ আন্তঃমন্ত্রক দল গঠন করা হয়েছে, যারা প্রতি মুহূর্তের খবরাখবর রাখছে।
পাশাপাশি, ঘরোয়া যোগান স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন পড়লে দ্রুত কয়লা আমদানি বাড়ানোর বিকল্পও খোলা রাখা হয়েছে। উৎসবের আলো বিঘ্নিত না করে সরকার শেষ পর্যন্ত কতটা নির্বিঘ্নে এই চাপ সামাল দিতে পারে, এখন সেটাই দেখার।
-অঙ্কিতা পাল