ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস থেকে সাইনবোর্ড ভেঙে দেওয়ার ঘটনার পর থেকেই চরম উত্তপ্ত কলকাতার রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বৃহস্পতিবার রাতের অন্ধকারে নতুন ব্যানার টাঙানো, শেক্সপিয়র সরণি থানায় জামিন অযোগ্য ধারায় একাধিক এফআইআর ও ১৩ জনের গ্রেপ্তারির পর শুক্রবার সকালে সোজা কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল। তবে জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন জানালেও আদালত থেকে কোনো অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ পেল না তারা। ফলে প্রথম রাউন্ডের আইনি লড়াইয়ে খালি হাতেই ফিরতে হলো বিরোধী শিবিরকে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে পুরসভা ও পুলিশের হস্তক্ষেপে সাইনবোর্ড নামিয়ে নেওয়ার পরও নাটক শেষ হয়নি। রাতের অন্ধকারেই ৯ নম্বর ক্যামাক স্ট্রিটের ওই কার্যালয়ের ছাদে ফের ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ লেখা নতুন ব্যানার ঝুলিয়ে দেন দলের নেতা-কর্মীরা। এরপরই সামাজিক মাধ্যমে সরব হন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেন, ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের ঠিক আগের দিন শাসক দল বিজেপির নির্দেশে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই পুলিশ ও পুরসভা অতিসক্রিয় হয়ে এই অভিযান চালিয়েছে। কোনো নোটিস ছাড়া ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে বেআইনিভাবে ঢুকে ভাঙচুর চালানো হয়েছে বলেও তোপ দাগেন তিনি।
আরও পড়ুন “কত বড় বুকের পাটা!” ক্যাথিড্রাল রোড থেকে বিজেপি সরকারকে উৎখাত করার ডাক মমতার
ঘটনার পরেই কড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে কলকাতা পুলিশ ও পুরসভা। শেক্সপিয়র সরণি থানায় মোট তিনটি আলাদা এফআইআর দায়ের করা হয়। যার মধ্যে একটি পুরসভার তরফে, একটি শেক্সপিয়র সরণি থানার এবং অন্যটি দায়ের করেন পার্ক স্ট্রিট থানার এক সার্জেন্ট। সরকারি কাজে বাধা, পুলিশকে মারধর এবং ডিউটিতে থাকা এক মহিলা পুলিশকর্মীকে হেনস্থা ও শ্লীলতাহানির চেষ্টার মতো একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু হয়। অভিযুক্ত হিসেবে নাম ওঠে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও হুমায়ুন কবীরদের। রাতভর অভিযান চালিয়ে পুলিশ এখনও পর্যন্ত মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
শুক্রবার সকালেই আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তৃণমূল। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির অনুমতির পর বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরীর এজলাসে জরুরি ভিত্তিতে ওঠে মামলাটি। তৃণমূলের আইনজীবী কিশোর দত্ত সওয়ালে অভিযোগ করেন, কোনো আগাম নোটিস ছাড়াই হঠকারীভাবে পুরসভা সাইনবোর্ড ভেঙে দিয়েছে। আদালত অবিলম্বে খুলে ফেলা নেমবোর্ডটি পুনরায় লাগানোর নির্দেশ দিক, পুরসভার থেকে ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দিক এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ জারি করুক।
তবে শুনানিতে একাধিক আইনি ত্রুটি ও অসঙ্গতি সামনে আসায় তৃণমূলের সমস্ত আবেদন খারিজ করে দেন বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী। তিনি সাফ জানান, নেমবোর্ড তো ইতিমধ্যেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তাই এই অবস্থায় আদালতের কোনো অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই। ক্ষতিপূরণ বা মেরামতের দাবি কখনো অন্তর্বর্তী নির্দেশ হতে পারে না। একই সঙ্গে তৃণমূলের মামলাকারী শুভাশিস চক্রবর্তী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার যে দাবি করেছিলেন, তা তথ্যের দিক থেকে ভুল প্রমাণিত হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত।
অন্যদিকে, বহুতলের মূল মালিকের আইনজীবী জয়দীপ কর আদালতে জানান, বাড়ির মালিকের অভিযোগের ভিত্তিতেই পুরসভা গিয়েছে। কোনো অনুমতি, বৈধ লাইসেন্স বা পুরসভাকে কর না দিয়েই বেআইনিভাবে ওই হোর্ডিং লাগানো হয়েছিল। পুরসভার আইনজীবী বিল্বদল ভট্টাচার্যও সওয়াল করেন, পুরসভাকে মামলার কপি না দিয়ে একতরফা কোনো নির্দেশ চাওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতকে আইনি স্বস্তিতে রূপ দিতে গিয়ে শুরুতেই বড়সড় ধাক্কা খেল বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, সব পক্ষ লিখিতভাবে নিজেদের বক্তব্য বা হলফনামা জমা দেওয়ার পরেই মূল মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। একদিকে পুলিশের জামিন অযোগ্য মামলার চাপ ও ১৩ জনের গ্রেপ্তার, অন্যদিকে হাই কোর্টের কোনো তাৎক্ষণিক রক্ষাকবচ না মেলা, ক্যামাক স্ট্রিটের এই ঘটনা এখন শাসক বিজেপির প্রশাসনিক অবস্থান বনাম বিরোধী তৃণমূলের আন্দোলনের এক চরম সংঘাতের মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
-জ্যোতি সরকার