মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার মুর্শিদাবাদ সফরে গিয়েই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে চরম হুঁশিয়ারি দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। জেলা সফরে গিয়ে একদিকে যেমন তিনি আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সাম্প্রতিক ‘ভাষণবাজি’র কড়া জবাব দিয়েছেন, তেমনই আগামী সোমবার থেকে গোটা পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত কড়া ‘গুন্ডাদমন আইন’ কার্যকর করার বড় ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে সরকারি কাজে গাফিলতি ও জালিয়াতি রুখতে কড়া বার্তা দিয়েছেন প্রশাসনের অন্দরেও।
বহরমপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিধানসভায় ইতিপূর্বে পাশ হওয়া ‘গুন্ডাদমন’ এবং ‘প্রিভেন্টিভ অ্যারেস্ট’ (আগাম গ্রেফতারি) সংক্রান্ত বিলে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন রাজ্যপাল আর. এন. রবি। ফলে আগামী সোমবার থেকেই রাজ্যে বলবৎ হচ্ছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’। এই নতুন আইনের অধীনে রাজ্যে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা, উস্কানি বা দাঙ্গা ছড়ানোর চেষ্টা হলে, পুলিশ অপরাধ ঘটার আগেই সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করার বিশেষ এক্তিয়ার পাবে। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানান, ট্রেন-বাস জ্বালানো বা পুলিশকে মারধর করার দিন এবার অতীত। শুধু তাই নয়, গুজরাত ও উত্তরপ্রদেশের ধাঁচে এবার থেকে সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করা হলে, সেই ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ আর্থিক দায় অভিযুক্তদের কাছ থেকেই উসুল করা হবে।
রেজিনগরের জনসভা থেকে নাম না করে বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের লাখ লাখ কর্মী নিয়ে জেল ভরার প্রচ্ছন্ন হুমকিকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সংবিধান মেনে উন্নয়নের কথা বলুন, কোনো রকম অরাজকতা বরদাস্ত করা হবে না। পাশাপাশি, জেলায় ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ ও সংখ্যালঘু স্কলারশিপের মতো প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আধার লিঙ্ক এবং কেওয়াইসি (KYC) যাচাই করতে গিয়েই প্রায় ৬০০টি ভুয়ো উপভোক্তা এবং ৩৪টি ভুয়ো জন্ম শংসাপত্র দেওয়ার জালিয়াতি ধরা পড়েছে। এই তদন্তে বিডিও (BDO) কিংবা বিএমওএইচ (BMOH) যারাই দোষী প্রমাণিত হবেন, তাদের চাকরি যাওয়া ও জেলে যাওয়া নিশ্চিত।
উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মুর্শিদাবাদ ও মালদহের দীর্ঘদিনের জ্বলন্ত সমস্যা গঙ্গা ভাঙন রুখতে কেন্দ্রের সঙ্গে ৫০-৫০ অংশীদারিত্বে ৩,৬০০ কোটি টাকার মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু মুর্শিদাবাদ জেলাই পাবে ২,৫০০ কোটি টাকা। এছাড়াও মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে নিউরোসার্জারি ও কার্ডিয়াকসহ ৪টি নতুন বিভাগে ৮০টি আধুনিক বেডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, রাজ্যের ১ কোটি ২০ লক্ষ মহিলার জন্য ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ এবং যারা ‘আয়ুষ্মান ভারত’ পাবেন না, তাদের জন্য ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা’র মাধ্যমে ৫ লক্ষ টাকার ক্যাশলেস চিকিৎসার বড় ঘোষণা করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, মুর্শিদাবাদ সফর থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাজ্যে কোনো রকম তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, অনুপ্রবেশ কিংবা বাহুবল বরদাস্ত করা হবে না। একদিকে কঠোর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যদিকে একাধিক জনকল্যাণমুখী ও পরিকাঠামোগত প্রকল্পের মাধ্যমে জেলার খোলনলচে বদলে দেওয়াই যে তাঁর সরকারের মূল লক্ষ্য, তা এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সফর থেকে রাজ্যবাসীকে বুঝিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
-জ্যোতি সরকার
-