কলকাতা মেট্রোর জোকা-বিবাদী বাগ (পার্পল লাইন) প্রকল্পের কাজে এল এক অভূতপূর্ব সাফল্য। দীর্ঘ এক বছরের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা শেষে অবশেষে আলোর মুখ দেখল দানবাকৃতির টানেল বোরিং মেশিন (TBM) ‘দুর্গা’। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ খিদিরপুর থেকে আসা সুড়ঙ্গ পথটি সফলভাবে পার করে নির্মাণাধীন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মেট্রো স্টেশনের কংক্রিটের দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে এই বিশালাকার মেশিনটি। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায় যাকে বলা হয় এক দুর্দান্ত 'টানেল ব্রেকথ্রু'। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত ছিলেন মেট্রোরেলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা, নেপালের কনসাল জেনারেল, কলকাতা পুরসভার কমিশনার এবং হাওড়ার পুলিশ কমিশনারসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
আরও পড়ুন জলমগ্ন তিলোত্তমা! ৬ জেলায় ভারী বর্ষণের কমলা সতর্কতা, কবে থামবে এই তাণ্ডব?
মেট্রো রেল সূত্রে জানা গেছে, ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১০ জুলাই খিদিরপুরের সেন্ট টমাস স্কুলের মাঠে তৈরি করা 'লঞ্চিং শ্যাফ্ট' থেকে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু করেছিল ‘দুর্গা’। মাটির প্রায় ১৭ মিটার গভীর দিয়ে দীর্ঘ ১.৭ কিলোমিটার পথ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পাড়ি দিয়ে শুক্রবার সে তার গন্তব্যে পৌঁছাল। চেন্নাই থেকে আনা ৯৫ মিটার লম্বা এবং প্রায় ৬৫০ টন ওজনের এই নতুন প্রজন্মের টিবিএমটি প্রতি মিনিটে প্রায় ৮০ মিলিমিটার গতিতে মাটি কাটতে পারে। মাটির ওপরে ফোর্ট উইলিয়াম বা পিটিএস-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর এলাকা থাকা সত্ত্বেও, কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই এই কঠিন কাজ সম্পন্ন করেছেন ইঞ্জিনিয়াররা।
কলকাতার নরম মাটির প্রকৃতি এবং সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এই মেশিনে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বমানের আধুনিক প্রযুক্তি। মাটির নিচে কাজ করার সময় যাতে কোনওরকম ধস বা বিপত্তি না ঘটে, তার জন্য এতে যুক্ত করা হয়েছে ইনফ্লেটেবল সিল এবং প্রেসার ট্রান্সডিউসারের মতো উচ্চমানের সুরক্ষা প্রযুক্তি। মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সুড়ঙ্গ খননের সময় মাটির প্রতি মিলিমিটার মুভমেন্টের ওপর সার্বক্ষণিক নজর (রিয়েল-টাইম মনিটরিং) রাখা হচ্ছিল। ফলে কোনো রকম দুর্ঘটনা বা কারও চোট-আঘাত ছাড়াই অত্যন্ত নিরাপদে এই প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে। অতীতে পূর্ব-পশ্চিম মেট্রোর সুড়ঙ্গ খননের সময়ে টিবিএম ‘উর্বী’র ক্ষেত্রেও ঠিক এমন ম্যাজিক দেখেছিল কলকাতা।
বর্তমানে পার্পল লাইনে জোকা থেকে মাঝেরহাট পর্যন্ত উড়াল অংশে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু রয়েছে। বাকি থাকা ভূগর্ভস্থ অংশে কাজ দ্রুত শেষ করতে ‘দুর্গা’র পাশাপাশি সমান্তরাল জোকামুখী সুড়ঙ্গ তৈরির দায়িত্বে কাজ করে চলেছে তার সহকর্মী টিবিএম ‘দিব্যা’। আশা করা হচ্ছে, আগামী আগস্ট মাসের শেষদিকের মধ্যেই ‘দিব্যা’-ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্টেশনে ব্রেকথ্রু করবে। পরের ধাপে এই মেশিনগুলি দিয়েই ভিক্টোরিয়া থেকে পার্ক স্ট্রিট ছুঁয়ে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত সুড়ঙ্গ খননের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত টানেলের কাজ শেষ করার প্রাথমিক ডেডলাইন থাকলেও, মেট্রো রেলের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এই গোটা প্রজেক্টের কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
২০১০ সাল নাগাদ কাজ শুরুর পর থেকে দীর্ঘ দিন ধরে জমি জট, আইনি জটিলতা বা গাছ কাটা সংক্রান্ত নানা বাধায় বহু বার থমকেছে জোকা-বিবাদী বাগ মেট্রো প্রকল্প। তবে সরকারের সবুজ সংকেত ও প্রশাসনিক জট কেটে যাওয়ার পর এবার কার্যত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করেছে মেট্রো রেল। চিংড়িঘাটার রেকর্ড সময়ে লাইন জোড়ার পর ভিক্টোরিয়ার এই সাফল্য প্রমাণ করে দিল যে সব বাধা কাটিয়ে প্রজেক্টটি এখন একদম সঠিক ট্র্যাকে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, কলকাতার বুকে পাতাল রেলের এই নতুন ইতিহাস তিলোত্তমার যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বড় বিপ্লব আনতে চলেছে। সমস্ত জট এবং বাধা কাটিয়ে যেভাবে ‘দুর্গা’ ও ‘দিব্যা’ দ্রুত গতিতে সুড়ঙ্গ তৈরি করে চলেছে, তাতে জোকা থেকে এসপ্ল্যানেড রুটে দ্রুত গতিতে স্বপ্নের মেট্রো ছোটানো এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা। এই সাফল্য যেমন সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগ কমাবে, তেমনই কলকাতার মুকুটে জুড়বে এক নতুন সোনালী পালক।
-জ্যোতি সরকার