দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুরে নাবালিকা নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু ঘিরে নজিরবিহীন চাঞ্চল্য তৈরি হলো রাজ্যে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী এটি ‘আত্মরক্ষা’র ঘটনা হলেও, এই এনকাউন্টারকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতির অন্দরেই তৈরি হয়েছে তীব্র মতভেদ।
একদিকে যখন তৃণমূলের একাংশ একে ‘উত্তরপ্রদেশ ২.০’ বা ‘জঙ্গলরাজ’ বলে কটাক্ষ করছেন, অন্যদিকে তখন অন্য গোষ্ঠী অনড় সরকারের পাশে। আর এই রাজনৈতিক মহাযুদ্ধের মাঝেই এক চরম ট্র্যাজিক ছবি ধরা পড়ল নিহতের বাড়িতে, যেখানে নিজের সন্তানের মৃতদেহ নিতেও সাফ অস্বীকার করলেন জন্মদাত্রী মা।
বারুইপুর জেলা পুলিশের দাবি, ঘটনার তদন্তে গতি আনতে এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবার রাত পৌনে ১টা নাগাদ মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে নিয়ে সূর্যপুরের ঘটনাস্থলে যান তদন্তকারীরা। পুলিশের বয়ান অনুযায়ী, ঠিক তখনই নাটকীয় মোড় নেয় পরিস্থিতি। পুলিশের নজর এড়িয়ে আচমকাই এক কর্মীর থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে প্রভাস। তাকে আটকাতে গেলে সে পুলিশকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলিও চালায়। পাল্টা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতে বাধ্য হয় পুলিশ বাহিনীও। গুরুতর জখম অবস্থায় প্রভাসকে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য, এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যেই চতুর্থ ব্যক্তি কবীর মোল্লাকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এই এনকাউন্টারের খবর চাউর হতেই সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণটি ঘটেছে বর্তমান শাসকদলের অন্দরেই। মমতা পন্থী নেত্রী হিসেবে পরিচিত উপাসনা চৌধুরী সমাজমাধ্যমে সরাসরি প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন তদন্তের সদিচ্ছা নিয়েই। তাঁর বিস্ফোরক পোস্ট "রাজসাক্ষীকে মেরে আসল মাথাকে বাঁচানোর চেষ্টা?"
অন্য দিকে, কৃষ্ণনগর দক্ষিণের সাংসদ মহুয়া মৈত্র পুলিশের এই অতি-সক্রিয়তার তীব্র বিরোধিতা করে একে যোগীরাজ্যের ‘এনকাউন্টার সংস্কৃতি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। বর্তমান সরকারের পুলিশ প্রশাসনকে নিশানা করে সমাজমাধ্যমে মহুয়ার কড়া খোঁচা, "এ সব কী হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ? বাঙালিরা দয়া করে নতুন বাংলা, অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশ ২.০-কে স্বাগত জানান।" একে ‘জঙ্গলের আইন’ বলেও তোপ দাগেন তিনি।
তবে বিদ্রোহী তৃনমূলের অন্দরে এই সুর এক নয়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা এবং কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইনি এনকাউন্টারের বিধান রয়েছে এবং অপরাধী পালাতে গেলে পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপই করেছে। রাজ্য সরকারের পেশ করা ‘অপরাজিতা বিল’-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি ধর্ষকদের চূড়ান্ত শাস্তির পক্ষে সওয়াল করেন। রাজনৈতিক মহল অবশ্য মনে করাচ্ছে, অতীতে জয়নগর কাণ্ডের পর অভিনেতা-সাংসদ দেব কিংবা বিভিন্ন সময়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের গলাতেও ধর্ষকদের তাৎক্ষণিক এনকাউন্টার বা কড়া শাস্তির নিদান শোনা গিয়েছিল।
অন্য দিকে, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ চালুর পাশাপাশি এই এনকাউন্টারকেও কড়া প্রশাসনের অংশ হিসেবে দেখছে গেরুয়া শিবির। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার একে ‘বিধাতার বিচার’ বা ‘ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার’ বলে অভিহিত করেছেন। শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, কোনো রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় থেকে যে অপরাধী পার পাবে না, তা প্রমাণিত। একই সঙ্গে তিনি কামদুনি কাণ্ডের ফাইল নতুন করে খোলার দাবিও তুলেছেন।
বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে এনকাউন্টার সংস্কৃতির তীব্র বিরোধিতা করেছে কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন। ছাত্র পরিষদের সভানেত্রী প্রিয়াঙ্কা চৌধুরীর স্পষ্ট বক্তব্য, "আমাদের বিচারব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসি তো রয়েছেই। আগে বিচার হবে, প্রমাণ দাখিল হবে, বিচারব্যবস্থা সাজা ঠিক করবে। তাহলে এই এনকাউন্টার কেন?"
রাজনীতি ও প্রশাসনের এই টানাপোড়েন যখন মধ্যগগনে, তখন বারুইপুরে প্রভাসের ভাঙা ঘরে শুধুই নিস্তব্ধতা আর লজ্জা। বুধবার ভোরে পুলিশ যখন মা সন্ধ্যা মণ্ডলের কাছে ছেলের মৃত্যুর খবর নিয়ে যায় এবং পরিচয়পত্র চেয়ে জানতে চায় তিনি ছেলের দেহ দেখতে যাবেন কি না, এক মুহূর্ত সময় নেননি মা। চরম ক্ষোভ ও লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে সন্ধ্যা দেবী সাফ জানিয়ে দেন, "আমি ওর দেহ আনতে যাব না। ওকে দেখতেও চাই না। পরিবারের কেউ ওর দেহ আনতে যাবে না।" মায়ের নিষেধ অমান্য করে, নেশার ঘোরে অপরাধের অন্ধকার চোরাগলিতে পা বাড়ানো ছেলের এই পরিণতিকে স্রেফ ‘কর্মফল’ বলেই মনে করছেন এক অভাগী মা।
বারুইপুরের এই রোমহর্ষক ঘটনাপ্রবাহ অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে এক কড়া বার্তা, নাকি এর নেপথ্যে সত্যিই লুকিয়ে রয়েছে প্রভাবশালীদের আড়াল করার কোনো গভীর ষড়যন্ত্র, তা নিয়ে আপাতত তোলপাড় গোটা রাজ্য।
-অঙ্কিতা পাল