রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর প্রায় দু’মাস কেটে গেলেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে একচুলও সরলেন না তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শনিবার একটি ভিডিও বার্তায় একদিকে যেমন তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট লুটের অভিযোগ এনে সরব হয়েছেন, তেমনই দলের বিদ্রোহী শিবিরকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে দলের রাশ শক্ত করতে এক নজিরবিহীন সাংগঠনিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত মিলেছে।
আরও পড়ুন মমতার মুখে ‘সন্দেহের’ সুর, অভিমানী চন্দ্রিমার ইস্তফা! ক্ষোভে পা বাড়ালেন বিরোধী শিবিরের দিকেই?
এদিন মমতা জানান, এবার থেকে সর্বভারতীয় সভানেত্রীর পাশাপাশি দলের রাজ্য সভানেত্রীর দায়িত্বও নিজের কাঁধেই রাখছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক হিসেবে থাকছেন কুণাল ঘোষ ও মদন মিত্র।
বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই কার্যত আড়াআড়ি বিভক্ত হয়ে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলেরই একাংশ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি আলাদা শিবির গড়ে তুলেছে, যারা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে। ইতিমধ্যেই বিধানসভায় বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে এই শিবির। রাজনৈতিক মহলে জল্পনা, তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে দলীয় প্রতীক ‘জোড়া ফুল’-এর দাবিও জানাতে পারে। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার সরাসরি বিদ্রোহী শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন মমতা। তাঁর প্রশ্ন, “দু’টো মাসও ধৈর্য ধরতে পারলেন না?” অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তৃণমূল নেত্রী বলেন, “বেইমানি করারও একটা সীমা থাকা উচিত। আপনারা এখন সরাসরি বিজেপি করছেন। বিজেপি করবেন আর তৃণমূলের নাম ব্যবহার করবেন, সেটা হতে পারে না। সাহস থাকলে সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিন।”
দলীয় প্রতীক নিয়ে যে আইনি ও রাজনৈতিক টানাপড়েন তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন মমতা। নির্বাচন কমিশন ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে তীব্র কটাক্ষ করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে তৃণমূলকে ভাঙার চক্রান্ত চলছে। মমতার কথায়, “আমি জানি ওঁরা প্রতীক পাবে না। কিন্তু যদি ভ্যানিশ কুমার বাবু আমাদের দল শেষ করার জন্য প্রতীক দিয়েও দেন, তাতেও কিছু যায় আসে না। দরকার হলে আমি গলায় প্রতীক ঝুলিয়ে মানুষের কাছে বেরোব।”
এদিন তিনি আরও যোগ করেন, “ভাবছেন আমি মরে গেছি? আমাদের কর্মীরা শেষ হয়ে গেছে? প্রতীক কেড়ে নিতে পারেন, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। প্রতীক সেটাই, যেটা মানুষ গ্রহণ করে, তৃণমূল কর্মীরা গ্রহণ করে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। একদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদের আসল দাবিদার প্রমাণ করতে মরিয়া, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কড়া সাংগঠনিক পদক্ষেপে বুঝিয়ে দিলেন দলের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতেই থাকছে। একদিকে মমতা নিজেই রাজ্য ও সর্বভারতীয় স্তরে দলের প্রধান দায়িত্ব সামলাবেন, এবং তাঁর সঙ্গে কুণাল ঘোষ ও মদন মিত্রের মতো বিশ্বস্ত ও বাগ্মী নেতাদের ফ্রন্টলাইনে নিয়ে আসা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সর্বোপরি, দলীয় প্রতীক, সংগঠন এবং মূল রাজনৈতিক রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে আগামী দিনে এই সংঘাত যে আরও তীব্র রূপ নিতে চলেছে, মমতার এদিনের বার্তায় তা একেবারেই স্পষ্ট।
-অঙ্কিতা পাল