মেট্রোপলিটন ভবনের দলীয় কার্যালয় দখলকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের দুই শিবিরের দড়ি টানাটানি এবার পৌঁছাল এক চরম নাটকীয় মোড়ে। নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য তৃণমূলের সব পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। শুক্রবার মেট্রোপলিটন ভবনের ঘটনার পর তাঁর ‘বিশ্বস্ততা’ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্য সন্দেহ তোলায় তীব্র অভিমান ও ক্ষোভের জেরেই এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, মমতাকে পদত্যাগের চিঠি পাঠানোর পরপরই চন্দ্রিমা সোজা পৌঁছে যান বিধানসভায় এবং সেখানে তাকে ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে গিয়ে বসতে দেখা যায়। পুত্র সৌরভ বসু আগেই ঋতব্রতপন্থী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন, এবার ইস্তফা দিয়েই চন্দ্রিমার এই পদক্ষেপ ঘিরে তীব্র জল্পনা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
শনিবার দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি পাঠিয়ে চন্দ্রিমা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গত ৩ জুন কালীঘাটের বৈঠকে তাঁকে যে রাজ্য সভানেত্রীর পদে বসানো হয়েছিল, তা থেকে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। বর্তমানে আর যে যে পদে তিনি রয়েছেন, তা থেকেও ইস্তফা দিলেন। নির্বাচন কমিশনে তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব করা, দলের হয়ে যোগাযোগের দায়িত্ব সামলানো কিংবা তৃণমূল ও তার বিভিন্ন শাখা সংগঠনের বিভিন্ন ব্যাঙ্কে যে অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তার ‘সিগনেটরি’র দায়িত্ব (লেনদেনের সই করার অধিকার) থেকেও অব্যাহতি চেয়েছেন তিনি।
বিতর্কের সূত্রপাত শুক্রবার সন্ধ্যায় মেট্রোপলিটন ভবনের তৃণমূল কার্যালয়ে। সেখানে হঠাৎই হাজির হন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, সন্দীপন সাহা, আখরুজ্জামান, জাভেদ খানদের মতো ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের নেতারা। বেশ কিছুক্ষণ ভিতরে বসে কথাবার্তা বলার পর তাঁরা কার্যালয়ে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে চলে যান।
অভিযোগ, যখন ঋতব্রতেরা সেই ভবনে গিয়েছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন চন্দ্রিমা। কিন্তু তিনি ‘বিদ্রোহীদের’ দেখে ভবনে তালা না দিয়েই বেরিয়ে যান। চন্দ্রিমার নিজের দাবি, "মেট্রোপলিটন ভবনে বেশ কয়েক জন বিধায়ক গিয়েছিলেন। আমি যত ক্ষণ ছিলাম ওই বিধায়কেরা আমার সঙ্গে কথা বলেননি। আমি বাড়ি চলে আসার পর মমতাদি ফোন করতে বলেন। ফোন করলে বলেন, তুমি ওদের হাতে ভবন তুলে দিলে?"
এই একটি ফোনেই মূলত চিড় ধরে সম্পর্কে। নেত্রীর মুখে এমন সন্দেহের কথা শুনে চন্দ্রিমার মনে হয়েছে, এ ভাবে আসলে তাঁর আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। চন্দ্রিমা সাফ জানিয়েছেন, "ফেরার কিছু বিষয় নয়। বিশ্বাসযোগ্যতা যখন প্রশ্নচিহ্নের মুখে থাকে, তখন সেই জায়গায় ফেরা যায় না।"
সম্প্রতি চন্দ্রিমার পুত্র তথা কলকাতা পুরসভার ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর সৌরভ বসু ঋতব্রতপন্থী ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের কাউন্সিলরদের বৈঠকে যোগ দেন। পুত্র বিরোধী শিবিরে নাম লেখানোর পর থেকেই মা চন্দ্রিমা কতদিন মমতা-পন্থী শিবিরে থাকবেন, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। শুক্রবারের ঘটনা যেন সেই বারুদে অগ্নিসংযোগ করল।
চন্দ্রিমার এই ভবন ছেড়ে চলে যাওয়া এবং আকস্মিক পদত্যাগকে একেবারেই ভালোভাবে নেয়নি কালীঘাটপন্থী তৃণমূল শিবির। খবর পেয়ে শুক্রবারই মেট্রোপলিটন ভবনে পৌঁছান বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর দাবি, এই ‘দখলদারি’র নেপথ্যে রাজ্য সরকার এবং পুলিশের মদতও রয়েছে।
চন্দ্রিমার ইস্তফার পর কুণাল তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন অর্থ-সহ কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ দফতরে ছিলেন তিনি! তখন মনে হয়নি, আজ একটা কথায় খারাপ লাগছে? তখন অতগুলি দফতর পাওয়ার আনন্দে কি সব সর্বাঙ্গসুন্দর ছিল?"
কুণাল আরও বলেন, শুক্রবার যখন এ রকম ঘটছিল, তখন দলের সভানেত্রী হিসাবে চন্দ্রিমার আর কিছুক্ষণ ওই ভবনে বসে থাকা উচিত ছিল। অন্য সহকর্মীরা তাঁকে কিছু ক্ষণ অপেক্ষা করার অনুরোধ করলেও তিনি "এ সবে থাকব না" বলে গাড়ি ডেকে বেরিয়ে যান, যা একজন সভানেত্রীর থেকে মোটেও কাম্য নয়।
প্রসঙ্গত, কংগ্রেস রাজনীতিতে একসময় সোমেন মিত্রের অনুগামী চন্দ্রিমা গত কয়েক বছরে হয়ে উঠেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী ও অন্যতম প্রধান সেনাপতি। অর্থ ও স্বাস্থ্যের মতো রাজ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ হেভিওয়েট দফতরে মমতা নিজে মন্ত্রী থাকলেও প্রতিমন্ত্রীর পদে বসিয়েছিলেন চন্দ্রিমাকে। নেত্রীর পরে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিলেন তিনিই। দলনেত্রীর ঘনিষ্ঠদের একাংশ বলে, চন্দ্রিমা ছাড়া সরকারে এত ভরসা আর কাউকে করেননি মমতা।
এইবারের বিধানসভা নির্বাচনে চন্দ্রিমা হেরে যাওয়া সত্ত্বেও, এবং দলের কিছু নেতার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও দলের ভাঙন পর্বে চন্দ্রিমাকেই রাজ্য সভাপতির পদে বেছে নিয়েছিলেন নেত্রী। সেই চন্দ্রিমাই এবার মমতার বিশ্বাস হারানোর অপবাদে এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেললেন কালীঘাটের দেওয়া সমস্ত পদের দায়ভার।
-অঙ্কিতা পাল