স্কুলপড়ুয়াদের মিড-ডে মিলে ডিম বা মাছের মতো আমিষ খাবার বাদ দিয়ে কেন রাজমা-ডাল খাওয়ানো হবে? এই প্রশ্ন তুলে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হলো একটি জনস্বার্থ মামলা। একই সঙ্গে, মিড-ডে মিলের রান্নার দায়িত্ব ইসকনের (ISKCON) মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন মামলাকারী।
আরও পড়ুন কালীগঞ্জ কাণ্ডে রক্ষাকবচ চেয়ে হাইকোর্টে মহুয়া মৈত্র, দায়ের করলেন জোড়া মামলা
মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং শুনানির আগে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল (AG) সুরজিৎ নাথ মিত্র কিছুটা সময় চেয়েছিলেন। সেই আবেদন মঞ্জুর করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চ আগামী মঙ্গলবার এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।
হাইকোর্টে দায়ের হওয়া এই জনস্বার্থ মামলায় মূলত দুটি বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে:
পুষ্টির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা: মামলাকারীর অভিযোগ, মিড-ডে মিলের মেনু থেকে ডিম বা মাছ বাদ দিয়ে পড়ুয়াদের প্রয়োজনীয় আমিষ পুষ্টিগুণ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
কর্মসংস্থানে কোপ: রাজ্যের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) হাজার হাজার মহিলা দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে স্কুলে মিড-ডে মিলের রান্নার কাজ করে আসছেন। একটি নির্দিষ্ট সংস্থাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলে তাঁরা কাজ হারাবেন। এই সিদ্ধান্তের পিছনে কোনও অস্বচ্ছতা বা গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আর্জি জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাজ্য বাজেটে প্রাথমিকে মিড-ডে মিলের মাথাপিছু বরাদ্দ ৬ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করার ঘোষণা করা হয়। লক্ষ্য ছিল স্কুলপড়ুয়াদের প্রোটিনের ঘাটতি মেটানো। সেই সঙ্গেই জানানো হয়, কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করবে ইসকন।
পরবর্তীকালে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “ইসকন খাওয়াবে রান্না করে। আপত্তি থাকলে হরে কৃষ্ণ বলবেন না। খুব ভালো খাবার, শুদ্ধ খাবার পাবেন!” মুখ্যমন্ত্রীর এই বিবৃতির পর থেকেই জনমানসে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, তবে কি সরকারি স্কুলেও এবার পুরোপুরি নিরামিষ খাবারই বাধ্যতামূলক হতে চলেছে?
অন্যদিকে, পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে ক্রমবর্ধমান শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ডিম অত্যন্ত জরুরি। ডিমে উচ্চ জৈবমানসম্পন্ন প্রোটিন ছাড়াও ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন ডি, কোলিন এবং আয়রন থাকে। তাত্ত্বিকভাবে ডিমের বদলে সয়াবিন, পনির বা রাজমা দিয়ে প্রোটিনের অভাব পূরণ করা সম্ভব হলেও, বাস্তব চিত্রটা আলাদা। বাংলার অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কাছে ডিম একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রিয় খাদ্য। অন্য দিকে, রাজমা বা পনিরের মতো খাবার এ রাজ্যের বহু শিশুর রোজকার খাদ্যাভ্যাসের অংশ নয়। ফলে মেনুতে পুষ্টিকর খাবার লিখে দিলেই হবে না, শিশুরা সেটা খাচ্ছে কি না তাও দেখতে হবে। খাদ্যে রুচি না থাকলে অপচয় বাড়বে, যা প্রকারান্তরে অপষ্টির লড়াইকে ব্যর্থ করবে।
মিড-ডে মিলের এই নতুন বিকেন্দ্রীকরণ নীতির ফলে বড়সড় ধাক্কা খেতে পারে গ্রামীণ ও শহরের নিম্নবিত্ত অর্থনীতি। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রাঁধুনি, সহায়িকা ও পরিবহণকর্মীদের সিংহভাগই নিম্ন আয়ের পরিবারের মহিলা। এই কাজের মাধ্যমেই তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। মামলাকারীর দাবি, গোটা ব্যবস্থাটি একটি মাত্র সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত হলে এই বিপুল সংখ্যক মহিলা এক ধাক্কায় কর্মহীন হয়ে পড়বেন। বিঘ্নিত হবে বিদ্যালয় স্তরে সামাজিক অংশগ্রহণের চেনা পরিমণ্ডলও।
আগামী মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির এজলাসে এই মামলার জল কোন দিকে গড়ায়, এখন সেদিকেই নজর ওয়াকিবহাল মহলের।
-অঙ্কিতা পাল