রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদল হতেই পাহাড়ের রাজনীতিতে বিরাট ভোলবদল। গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (GTA) বা জিটিএ-র চিফ এক্সিকিউটিভ এবং সভাসদ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার প্রধান অনীত থাপা। বুধবার সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা দিয়ে নিজেই এই পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। ২০২২ সালে এই পদে বসেছিলেন অনীত। যদিও মেয়াদ আরও এক বছর বাকি ছিল, তবে পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে তার আগেই সরে দাঁড়ালেন তিনি।
আরও পড়ুন উত্তরবঙ্গে অতি ভারী বৃষ্টির ‘কমলা সতর্কতা’, দক্ষিণে অস্বস্তিকর গরমের পর ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস
ওই বার্তায় অনীত জানান, রাজ্যে নতুন সরকার এসেছে এবং পাহাড় তথা রাজ্যের মানুষ এই সরকারের প্রতি আস্থাশীল হয়ে বিজেপির পক্ষে রায় দিয়েছে। তাই জনতার রায় এবং দায় মাথা পেতে নিয়েই তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। অনীতের আরও অভিযোগ, ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে গঠিত জিটিএ-কে বর্তমান বিজেপি সরকার কোনো গুরুত্বই দিতে চাইছে না। এই পরিস্থিতিতে শুধু শুধু পদ আঁকড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। তবে পাহাড়ের স্থায়ী সমাধান বা আলাদা গোর্খ্যাল্যান্ড রাজ্য নিয়ে নতুন বিজেপি সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, আপাতত সেদিকেই তাঁরা নজর রাখবেন।
এবিষয়ে রাজনৈতিক মহলের মতে, অনীতের এই ইস্তফা একেবারেই আকস্মিক নয়, এর পেছনে রয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপ। গত মঙ্গলবারই কার্শিয়াঙে দাঁড়িয়ে জিটিএ-র দুর্নীতি নিয়ে সরাসরি জেলে ভরার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, জিটিএ-তে যে বিপুল দুর্নীতি হয়েছে তার তদন্ত হবে এবং চোরদের কাউকে ছাড়া হবে না। এর আগেও মে মাসে উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়েও জিটিএ-র দুর্নীতির তদন্তের কথা বলেছিলেন তিনি।
যদিও অনীতের পাল্টা দাবি ছিল, তদন্ত হলে ২০১২ সালের সূচনালগ্ন (যখন ক্ষমতায় ছিল বিজেপির বর্তমান সঙ্গী গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা) থেকেই হোক। কিন্তু লাগাতার এই চাপ ও নতুন সরকারের তরফ থেকে কোনো ডাক না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ইস্তফার পথই বেছে নিলেন তিনি। ওদিকে, অনীতের এই পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে লুফে নিয়েছে পাহাড়ের বিরোধী শিবির।
দার্জিলিঙের বিজেপি বিধায়ক নোমান এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, পুরনো সরকার আর নেই, নতুন সরকার পাহাড়ের স্থায়ী সমাধানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাই ইস্তফা দিয়ে অনীত সঠিক কাজই করেছেন। অন্যদিকে, জিএনএলএফ সুপ্রিমো মন ঘিসিং আরও সুর চড়িয়ে বলেন, জনতার রায় মেনে এবার বাকি সব সভাসদদেরও পদত্যাগ করা উচিত। পাশাপাশি ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট-এর অজয় এডওয়ার্ডসও জিটিএ দুর্নীতি ইস্যুতে অনীতকে তীব্র নিশানা করেন।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে রাজ্য, কেন্দ্র ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে জিটিএ-র জন্ম হয়েছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটনসহ ৫৯টি বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা রয়েছে এই সংস্থার হাতে। ২০২২ সালের নির্বাচনে ৪৫টি আসনের মধ্যে অনীত থাপার দল একাই ২৭টি আসনে জিতে বোর্ড গড়েছিল। তৎকালীন শাসকদল তৃণমূলের সাথে জোট বেঁধে লড়াই করায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ৫টি আসনে জিতেছিল, যেখানে বিমল গুরুংয়ের দল অংশ নেয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে দার্জিলিং ও কার্শিয়াঙের সবকটি আসনেই বিজেপি জয়ী হওয়ায় এবং রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায় শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের রাশ হাতছাড়া হল অনীত থাপার।
-দিশা দাস