সর্বশেষ সংবাদ
কল্যাণের হুঙ্কারের পরেই স্পিকারের দরবারে কাকলি! এবার কি পদ খোয়াবেন শ্রীরামপুরের সাংসদ?

কল্যাণের হুঙ্কারের পরেই স্পিকারের দরবারে কাকলি! এবার কি পদ খোয়াবেন শ্রীরামপুরের সাংসদ?

লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই বাংলার রাজনীতিতে একের পর এক নাটকীয় মোড় দেখা যাচ্ছে। তবে এবার যা ঘটল, তা এককথায় নজিরবিহীন। আপাতদৃষ্টিতে যা কেবল তৃণমূলের অন্দরের ক্ষোভ বা দলবদল বলে মনে হচ্ছিল, তা এবার সরাসরি দিল্লির সংসদ ভবনে এক মারাত্মক আইনি লড়াইয়ের রূপ নিল। একসময়ের দলীয় সতীর্থ, শ্রীরামপুরের প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে বিস্ফোরক চিঠি পাঠালেন বারাসতের সাংসদ তথা সদ্য গঠিত ‘এনসিপিআই’ শিবিরের অগ্রণী নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদার। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লোকসভা থেকে সোজা বরখাস্ত বা বহিষ্কার করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তিনি।

 

আরও পড়ুন কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের ৭ জেলায় ধেয়ে আসছে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি, জারি লাল সতর্কতা

 

গত ১০ জুন স্পিকার ওম বিড়লাকে পাঠানো ওই চিঠিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার শ্রীরামপুরের সাংসদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তাঁর মূল অভিযোগ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভা কক্ষের ভেতরে সব ভদ্রতা ও শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে বারবার তাঁর এবং সংসদের অন্যান্য মহিলা সাংসদদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত আপত্তিকর, কুরুচিপূর্ণ এবং নারী-বিরোধী মন্তব্য করেছেন। কাকলি দেবীর দাবি, এই ধরনের আচরণ কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি কল্যাণবাবুর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিনিয়ত সহকর্মী মহিলাদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ ও মানসিক হেনস্থা করছেন। এর ফলে সংসদের ভেতরে এমন এক অস্বস্তিকর ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে মহিলা জনপ্রতিনিধিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে বা কোনো আলোচনায় অংশ নিতে দ্বিধাবোধ করছেন।

রাজনৈতিক মহলের খবর, এই লড়াইয়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদার কিন্তু সহজে দমে যাওয়ার পাত্রী নন। কল্যাণের এই নারীবিদ্বেষী আচরণের বিরুদ্ধে এবং তাঁর সাংসদ পদ কাড়ার দাবিতে গত ২৮ মে প্রথমবার লোকসভার স্পিকারকে চিঠি লিখেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রথম চিঠির পর দিনকয়েক কেটে গেলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায়, গত ১০ জুন আবার স্পিকারকে দ্বিতীয়বার চিঠি পাঠান কাকলি। এই দ্বিতীয় চিঠিতে তিনি ওম বিড়লাকে ওঁর পুরনো অভিযোগের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেন এবং আর সময় নষ্ট না করে অভিযুক্ত সাংসদের বিরুদ্ধে দ্রুত সংসদীয় আইন (৩৪৯ ধারা) অনুযায়ী কড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।

অন্যদিকে, এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগের জবাবে শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও কিন্তু চুপ করে বসে থাকার মানুষ নন। তিনি অত্যন্ত কড়া সুরে কাকলি দেবীর বিরুদ্ধে পাল্টা যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। কল্যাণবাবু স্পষ্ট জানিয়েছেন, এবার তিনিও কাকলি ঘোষ দস্তিদারের বিরুদ্ধে লোকসভার স্পিকারের কাছে পাল্টা চিঠি পাঠাবেন। তিনি স্পিকারকে মনে করিয়ে দেবেন যে, নারদা কেলেঙ্কারিতে কীভাবে কাকলি দেবীর নাম জড়িয়েছিল এবং ওনাকে নগদ ৫ লক্ষ টাকা নিতে দেখা গিয়েছিল। সেই সময়ে ওঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে যে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল, তা যাতে এবার দ্রুত দেওয়া হয়, সেই দাবিই জানাবেন তিনি। একই সাথে কাকলির এই অভিযোগের সময় নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে কল্যাণ বলেন, "যদি আমি লোকসভার ভেতরে মহিলাদের সম্পর্কে সত্যিই কোনো খারাপ মন্তব্য করে থাকি, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ জানানো হলো না কেন? ৪ মে-র পর হঠাৎ এখন কেন এই অভিযোগ করা হচ্ছে?"

রাজ্যে বিধানসভা ভোটের পর থেকেই তৃণমূলের ভেতরের রদবদল এবং বিশেষ করে মুখ্যসচেতক পদে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফিরে আসার পর থেকেই কাকলি দেবীর মনে ক্ষোভ জমছিল। অতি সম্প্রতি যখন কাকলি দেবীর নেতৃত্বে তৃণমূলের ২০ জন বিক্ষুব্ধ সাংসদ দল ছেড়ে ওম বিড়লার নতুন দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-তে যোগ দেন, তখন কল্যাণবাবু খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছিলেন, ক্ষমতা থাকলে তাঁরা যেন এবার বিজেপির টিকিটে নতুন করে জিতে দেখান। কল্যাণের সেই হুঙ্কারের পাল্টা চাল হিসেবেই এবার ওঁর সাংসদ পদ খারিজের দাবিতে স্পিকারের দরবারে সরব হলেন কাকলি। একসময়ের একই দলের দুই হেভিওয়েট নেতার এই প্রকাশ্য কাদা ছোড়াছুড়ি এখন দিল্লির অলিন্দে বঙ্গ রাজনীতিকে চরম উত্তপ্ত করে তুলেছে। এখন দেখার বিষয় এটাই যে, লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা শেষ পর্যন্ত কার চিঠিতে সিলমোহর দেন এবং এই লড়াই আগামী দিনে আর কোন দিকে মোড় নেয়।

                                                                                                                                                                                                                                                   -জ্যোতি সরকার

পরবর্তী খবর