বাংলার রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় মোড়। তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ দল ছাড়তেই জাতীয় রাজনীতিতে বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত মিলছে। রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা- এবার মোদী সরকারে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব পেতে চলেছেন উত্তর কলকাতার প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বর্ধমান পূর্বের সাংসদ শর্মিলা সরকার। এই দুই সাংসদই কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী পদ পেতে পারেন বলে জোরালো খবর আসছে দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দ থেকে।
আরও পড়ুন প্রাথমিকে ১০০ কোটির দুর্নীতির ছক! সিবিআই চার্জশিটের কোন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অভিষেককে তলব ইডির?
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে এই বড়সড় ভাঙনের পর ২৪ ঘণ্টাও কাটেনি, তার মধ্যেই বিদ্রোহী শিবিরের ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নেওয়ার এই তৎপরতা বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
গত রবিবার (১৪ জুন) তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ দলনেত্রীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ত্রিপুরার দল 'এনসিপিআই' (NCPI)-তে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এরপরই গতকাল দিল্লিতে শুরু হয় চরম রাজনৈতিক তৎপরতা। প্রথমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে বিজেপি নেতা নিশিকান্ত দুবের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন বিক্ষুব্ধ সাংসদরা। সেখান থেকে তাঁরা সোজা চলে যান লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বাসভবনে। স্পিকারের হাতে ২০ জন সাংসদের সই করা একটি চিঠি তুলে দেওয়া হয়, যেখানে টেকনিক্যালি তৃণমূলের এই অংশটি NCPI দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আইনি আবেদন জানিয়েছে।
রাজনৈতিক পরিসংখ্যানের দিক থেকে এই দলবদল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে লোকসভায় NCPI-এর কোনো সাংসদ ছিল না। কিন্তু তৃণমূলের ২০ জন হেভিওয়েট সাংসদ যোগ দেওয়ায় রাতারাতি লোকসভায় খাতা খুলেই চমক দিল এই দল। বর্তমান আসন সংখ্যার বিচারে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) পর এনডিএ (NDA) জোটের সবচেয়ে বড় শরিক দল হতে চলেছে এই NCPI। কারণ নীতীশ কুমারের জেডিইউ বা চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপির চেয়েও এদের সাংসদ সংখ্যা এখন বেশি। বর্তমানে NCPI-এর শীর্ষ নেতৃত্ব দিল্লিতে রয়েছেন এবং বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন।
এদিকে এই দলবদলকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্দরে ক্ষোভ ও পাল্টাপাল্টি আক্রমণ শুরু হয়েছে। দলের অন্যতম মুখপাত্র কুণাল ঘোষ একে 'বড় বিশ্বাসঘাতকতা' বলে উল্লেখ করেছেন। তবে NCPI-এর প্রতিষ্ঠাতার দাবি, যাঁরা যোগ দিচ্ছেন তাঁরা সমস্ত আইনি ও প্রযুক্তিগত দিক খতিয়ে দেখেই পা বাড়িয়েছেন, যাতে দলত্যাগ বিরোধী আইনের কোপে পড়তে না হয়। শুধু সাংসদই নয়, রাজ্যে বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের সংখ্যাও প্রায় ৬৫ ছুঁয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে দাবি করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের আবহে এবং কলকাতার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে এই দলবদল এবং সুদীপ-শর্মিলার সম্ভাব্য মন্ত্রিত্ব লাভ অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী। একদিকে রাজ্য রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি ও নতুন জোট সরকার গঠনের তৎপরতা, অন্যদিকে দিল্লির দরবারে বাংলার বিদ্রোহী সাংসদদের এই গুরুত্ব বৃদ্ধি, আগামী দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য বড়সড় ধাক্কা হতে চলেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন দেখার, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শর্মিলা সরকারের লালবাতি গাড়িতে চড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কখন আসে।
-জ্যোতি সরকার