আহমেদাবাদ রানওয়ে থেকে ওড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে গিয়েছিল সেই ভয়াবহ বিপর্যয়। দেখতে দেখতে এক বছর পার হয়ে গেল এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ বিমান দুর্ঘটনার। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে এক বছরের মাথায় যেখানে চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট সামনে আসার কথা, সেখানে এখনও ধোঁয়াশায় ঢাকা আসল কারণ।
এয়ারক্র্যাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB)-র তদন্তকারী দল, ভারতের অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক এবং আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড’ (NTSB) একযোগে কাজ করলেও চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশে আরও বিলম্ব হবে বলেই খবর।
তদন্ত প্রক্রিয়ার এই ধীরগতির নেপথ্যে উঠে আসছে এক অন্য সমীকরণ। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, দুর্ঘটনার এক বছরের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া সম্ভব না হলে প্রতি বছর একটি করে অন্তর্বর্তী রিপোর্ট পেশ করতে হয় এবং বিলম্বের কারণ স্পষ্ট করতে হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ‘রয়টার্স’ এবং ‘ব্লুমবার্গ’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তকারীদের মূল নজর এখন আটকে রয়েছে অভিশপ্ত বিমানটির ইঞ্জিনের ওপর।
সূত্রের খবর, গত এপ্রিল মাসেই দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটির ইঞ্জিন পরীক্ষা করা হয়েছিল। এরপর মে মাসে তদন্তের খাতিরে ফ্রান্সেও যান আধিকারিকরা। যদিও সরকারিভাবে এই বিষয়ে মুখ খোলেনি কোনও পক্ষই। অন্যদিকে, ‘ব্লুমবার্গ’-এর দাবি, বিশদ পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য বিমানের ইঞ্জিনটি বর্তমানে আমেরিকায় পাঠানো হয়েছে। সেই ল্যাবরেটরি টেস্টের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ শেষ হতে আরও অন্তত তিন মাস সময় লেগে যেতে পারে। আর সেই কারণেই চূড়ান্ত রিপোর্টের পরিবর্তে আপাতত অন্তর্বর্তী রিপোর্টেই ভরসা রাখছেন তদন্তকারীরা।
২০২৫ সালের ১২ জুন। আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইকের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উল্টোদিকের একটি বিল্ডিংয়ে আছড়ে পড়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটি। যাত্রী ও বিমানকর্মী মিলিয়ে সলিলসমাধি ঘটেছিল ২৬০ জনের।
গত বছর প্রকাশিত একটি প্রাথমিক অন্তর্বর্তী রিপোর্টে ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের (CVR) যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছিল, তা এখনও নাড়িয়ে দেয় সবাইকে। রিপোর্টে জানা যায়, ওড়ার ঠিক শেষ মুহূর্তে বিমানের ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ আচমকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ‘রান’ পজিশন থেকে সুইচগুলি চলে গিয়েছিল ‘কাট অফ’ মোডে। ফলে দুই ইঞ্জিনের কোনওটিতেই জ্বালানি পৌঁছায়নি।
ককপিটের রেকর্ডিংয়ে ক্যাপ্টেন সুমিত সবরওয়াল এবং ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্দরের শেষ কথোপকথন ছিল অত্যন্ত ভীতিপ্রদ। এক পাইলটকে অন্য জনের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘‘কেন জ্বালানির সুইচ বন্ধ করে দিলে?’’ জবাবে দ্বিতীয় জন বলেন, ‘‘আমি কিছু বন্ধ করিনি।’’
যদিও এই কণ্ঠস্বর দুটির মধ্যে কোনটি কার, তা AAIB এখনও স্পষ্ট করেনি। তবে ককপিটের বসার বিন্যাস অনুযায়ী অনেকেই দায় চাপিয়েছিলেন প্রয়াত ক্যাপ্টেন সুমিতের ওপর। ছেলের ওপর ওঠা এই পরোক্ষ অপবাদ মানতে না পেরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সুমিতের বাবা। তাঁর দাবি ছিল, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত হোক, যাতে তাঁর মৃত ছেলের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত না হয়। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাও জানিয়েছে, শুধুমাত্র এই কণ্ঠস্বরের নমুনা থেকে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়।
দুর্ঘটনার পর গত অক্টোবর মাস থেকেই নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ। এই বিমানের যাত্রীদের তালিকায় ছিলেন গুজরাতের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানিও। সম্প্রতি তাঁর কন্যাসহ একাধিক পরিবারকে বিমান সংস্থার তরফে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, ক্ষতিপূরণ নেওয়ার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইন নেই। কাউকেই জোর করা হচ্ছে না।
তবে ক্ষতিপূরণের টাকা ঝুলিয়ে রাখার পেছনে কাজ করছে এক আইনি কৌশল। নিহতদের বহু আত্মীয়ই এখনও ক্ষতিপূরণ নিতে অস্বীকার করেছেন। তাঁরা অপেক্ষা করছেন চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্টের। যদি রিপোর্টে প্রমাণিত হয় যে এই দুর্ঘটনার পেছনে বিমান সংস্থার প্রযুক্তিগত গাফিলতি ছিল, তবে ক্ষতিপূরণ না নিয়ে সরাসরি এয়ার ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার পথ খোলা রাখছেন অনেকেই।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও ২৬০টি পরিবারের স্বজন হারানোর ক্ষত এখনও দগদগে। আর সেই ক্ষতের ওপর প্রলেপ দিতে পারে একমাত্র একটি স্বচ্ছ ও চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট, যার জন্য এখন চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে ওয়াকিবহাল মহল।
-অঙ্কিতা পাল