বড়সড় আইনি ও রাজনৈতিক সাঁড়াশি চাপের মুখে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় বিধায়কদের সই জাল করার মামলায় গতকালই ভবানী ভবনে সিআইডি দপ্তরে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। কিন্তু নাটক এখানেই শেষ নয়। এক মামলার রেশ কাটতে না কাটতেই আজ, বিকেলে ফের অভিষেকের কালীঘাটের বাড়িতে হানা দিল সিআইডি-র একটি তদন্তকারী দল। অন্যদিকে, এর মাঝেই ভোট পরবর্তী এক মামলায় অভিষেককে সশরীরে হাজিরার কড়া সমন পাঠিয়েছে ত্রিপুরার খোয়াই আদালতও। সব মিলিয়ে চরম অস্বস্তিতে তৃণমূলের এই হেভিওয়েট নেতা।
গোটা ঘটনার সূত্রপাত বিধানসভায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের সেই বিতর্কিত 'রেজোলিউশন কপি' নিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, ওই চিঠিতে বহু অনুপস্থিত বিধায়কের সই জাল করা হয়েছিল, যেখানে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেকেরও স্বাক্ষর ছিল। হাইকোর্টের কড়া নির্দেশে গতকাল বিকেল পৌনে ৬টা নাগাদ ভবানী ভবনে হাজিরা দেন অভিষেক। সিআইডি সূত্রে খবর, জেরা চলাকালীন সেই আসল রেজোলিউশন কপিটি কোথায় জানতে চাওয়া হলে অভিষেক সাফ বলেন, "জানি না"। এর পরেই আধিকারিকরা যখন তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি নিজের দায় এড়াতে পারেন না, তখনই তদন্তকারীদের ওপর মারাত্মকভাবে মেজাজ হারান তৃণমূল সাংসদ।
একবার মাত্র চায়ের বিরতি নিয়ে একটানা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা জেরা করা হলেও, অভিষেকের বারবার এড়িয়ে যাওয়ার মতো উত্তরে একেবারেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি তদন্তকারী আধিকারিকরা। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী আপাতত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ করা যাবে না ঠিকই, তবে তদন্তে এই চরম অসঙ্গতি ও অসহযোগিতার কারণে আগামী ১৪ জুন, রবিবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আবারও ভবানী ভবনে তলব করেছে সিআইডি।
গতকাল রাত সাড়ে ১১টায় ভবানী ভবন থেকে বেরোনোর সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি অভিষেক। উলটে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা এড়াতে অনুগামীদের কালো ছাতায় মুখ ঢেকে দ্রুত গাড়িতে উঠে যান তিনি। সেখান থেকে সোজা চলে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে। সেখানে মদন মিত্র এবং কুণাল ঘোষের উপস্থিতিতে মাঝরাত পর্যন্ত চলে এক হাই-ভোল্টেজ বৈঠক। তবে বৈঠক শেষে কুণাল ঘোষ জানান, পুরো বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষ, তাই এই নিয়ে দল এখনই কিছু বলবে না।
এরই মধ্যে গত বুধবার আরও এক বড় ধাক্কা এসেছে অভিষেকের কাছে। ২০২১ সালের একটি মামলার প্রেক্ষিতে এবার ত্রিপুরার খোয়াই আদালত সরাসরি সমন পাঠিয়েছে তাঁকে। আগামী ২২ জুন তাঁকে ত্রিপুরার আদালতে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আলিপুর আদালতের নিযুক্ত বেলিফ কালীঘাট থানার পুলিশকে সাথে নিয়ে মমতার হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ঠিকানায় গিয়ে এই নোটিশ রিসিভ করিয়ে আসেন। আর সেই রেশ কাটতে না কাটতেই, আজ বিকেলে ভোট প্রচারের সময়ে উস্কানিমূলক মন্তব্যের এক নতুন মামলার তদন্তে আচমকাই ফের অভিষেকের বাড়িতে হানা দেয় সিআইডি-র আরেকটি দল।
একদিকে দলের অন্দরে আইনজীবী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকাশ্য বিদ্রোহ, অন্যদিকে বিধানসভার সই জাল মামলায় সিআইডি-র রবিবারের ডেডলাইন, আজ বিকেলে ফের নতুন মামলায় সিআইডি হানা এবং ২২ জুনের ত্রিপুরার আদালতের সমন, সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও আইনি সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। চারদিকের এই প্রবল চাপ কাটিয়ে আগামী দিনে জল কোন দিকে গড়ায় এবং তৃণমূল নেতৃত্ব এর কী জবাব দেয়, এখন সেটাই দেখার।
-জ্যোতি সরকার