তীব্র উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক আর সময়ের সাথে এক চরম লড়াই! চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, অস্ত্রোপচার না করলে ৭৩ বছরের বৃদ্ধকে বাঁচানো অসম্ভব। কিন্তু তার আগেই সামনে এলো এমন এক কঠিন সত্য, যা শুনে পরিবারের সবার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করতেই জানা গেল, বৃদ্ধের শরীরে বইছে এমন এক রক্ত যা সাধারণ কোনো রক্ত নয়, বরং গোটা বিশ্বের অন্যতম বিরলতম রক্তের গ্রুপ, যার নাম 'বোম্বে নেগেটিভ'। পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকের একটি হাসপাতালে যখন সবাই দিশেহারা, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য আন্তর্জাতিক মানের কো-অর্ডিনেশন। অবশেষে একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও মানুষের যৌথ প্রচেষ্টায় মুম্বাই থেকে বিমানে করে রক্ত এনে বাঁচানো গেল সেই বৃদ্ধের প্রাণ।
ঘটনার সূত্রপাত পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকে। সেখানকার বাসিন্দা, ৭৩ বছর বয়সী শ্রী প্রবাল কুমার মান্না একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন। তাঁর উরুর হাড় বা ফিমার ভেঙে যাওয়ায় জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, অস্ত্রোপচারের আগে যখন তাঁর রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ও রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা হয়, তখনই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। চিকিৎসকরা জানান, তাঁর রক্তের গ্রুপ 'বোম্বে নেগেটিভ', যা মানুষের রক্তের ধরনগুলোর মধ্যে অন্যতম বিরলতম একটি রূপ। এই রক্ত সহজে মেলা অসম্ভব। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিবারের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। কীভাবে এই বিরল রক্ত জোগাড় হবে, তা ভেবেই সবাই দিশেহারা হয়ে পড়েন।
আরও পড়ুন চরম উত্তেজনার মুখেও ঠান্ডা মাথায় বাজিমাত! ঢাকা ছাড়ার আগে কী বার্তা দিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার?
এই কঠিন পরিস্থিতিতে পরিবারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে যোগাযোগ করা হয় খেজুরি-ভিত্তিক রক্তদাতা সংস্থা 'উজান' (Ujan)-এর সাথে। এই সংস্থাটি আসলে 'ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ব্লাড ডোনার্স অর্গানাইজেশনস' (FIBDO)-এর একটি অন্যতম সদস্য সংগঠন। 'উজান'-এর প্রতিনিধি প্রতীক দাস মুহূর্তের মধ্যে এই সংকটের কথা FIBDO-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখাকে জানান। রাজ্য শাখা তৎক্ষণাৎ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করে এবং দেশজুড়ে রক্ত খোঁজার এক ম্যারাথন মিশন শুরু হয়ে যায়। মহারাষ্ট্র, কেরল, তামিলনাড়ু এবং কর্ণাটকের মতো একাধিক রাজ্যের FIBDO শাখাগুলো তাদের প্রাত্যহিক সেবাকাজের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
চারদিকে খোঁজাখুঁজির পর জানা যায় যে, কেরল অথবা মুম্বাই থেকে এই বিরল রক্তের ইউনিট সংগ্রহ করা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, প্রথম ইউনিটের রক্ত মুম্বাই থেকেই আনা হবে। মুম্বাইয়ে এই রক্তের যাবতীয় ব্যবস্থা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করার জন্য এগিয়ে আসেন বিনয় শেঠি। তাঁরই আন্তরিক উদ্যোগে মুম্বাই থেকে রক্তের প্রথম ইউনিটটি বিমানে করে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। গত ১৪ই মে ২০২৬ তারিখে রক্তের ইউনিটটি কলকাতা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। সেখান থেকে এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালের ব্লাড সেন্টার পর্যন্ত রক্তটি গ্রিন করিডোরের মতো অত্যন্ত নিরাপদে ও দ্রুততার সাথে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেন 'লেট আস কেয়ার ফর ইউ' (LUCY) নামক সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা।
মিশনের সাফল্য কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আমাদের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে 'বোম্বে নেগেটিভ' রক্তের মাত্র একজনই নথিভুক্ত দাতা বা ডোনার রয়েছেন। FIBDO-এর রাজ্য শাখা miraculously তাঁর সাথেও যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। সেই মহান মানবিক ব্যক্তি আজ নিজেই কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে এসে স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। যার ফলে প্রবাল বাবুর অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় ইউনিট রক্তটিও আমাদের রাজ্য থেকেই সংগৃহীত হয়ে যায়।
সবমিলিয়ে যৌথ লড়াইয়ের অভূতপূর্ব জয়
একটি মানুষের জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে তমলুক থেকে খেজুরি, আর কলকাতা থেকে মুম্বাই ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে গড়ে ওঠা এই সম্মিলিত মানবিক প্রচেষ্টার মূল কাণ্ডারী ছিলেন FIBDO-এর ন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট তথা ভারত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের 'ন্যাশনাল ব্লাড ট্রান্সফিউশন কাউন্সিল'-এর গভর্নিং বডি মেম্বার বিশ্বরূপ বিশ্বাস। তাঁরই নিখুঁত নেতৃত্বে এবং একাধিক সংগঠনের আন্তরিক মেলবন্ধনে এই অসম্ভব মিশন সফল হয়েছে। এই অভাবনীয় ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিল যে, বিপদের মেঘ যতই কালো হোক না কেন, মানুষের সদিচ্ছা আর যৌথ লড়াইয়ের সামনে কোনো বাধাই টিকতে পারে না। কারণ, দিনশেষে একটাই সত্য, "একসাথে আমরা পারি, একসাথে আমরা পারবই।"
- জ্যোতি সরকার