১৮৯৭ সালের ১লা মে কলকাতার বাগবাজারের বলরাম বসুর বাড়িতে এক বিকেলে জড়ো হয়েছিলেন একদল মানুষ। তাঁদের লক্ষ্য কোনো রাজনৈতিক সভা বা আড্ডা ছিল না। সেই ঘরে উপস্থিত ছিলেন এক তেজোদীপ্ত সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি সেদিন এমন এক সংগঠনের বীজ বপন করেছিলেন, যা আগামী দিনে শুধু ভারত নয়, পুরো পৃথিবীর সেবার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। কোনো আড়ম্বর ছাড়াই, নিঃশব্দে সেদিন জন্ম নিয়েছিল 'রামকৃষ্ণ মিশন'। আজ সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের ১২৭ বছর পূর্ণ হলো।
স্বামীজি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত ধর্ম কেবল আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলতেন, "জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর"। অর্থাৎ, মন্দিরে ভগবান খোঁজার আগে আর্ত মানুষের সেবা করা জরুরি। এই আদর্শকে সামনে রেখেই আনুষ্ঠানিকভাবে মিশনের যাত্রা শুরু হয়। মিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো 'আত্মনো মোক্ষার্থম্ জগদ্ধিতায় চ', অর্থাৎ নিজের মোক্ষলাভ এবং জগতের কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগ করা। এই দর্শনকে পাথেয় করেই শতবর্ষ পেরিয়ে আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে এই সংগঠন।
আরও পড়ুন ফলের অপেক্ষা নয়, রোগীর ডাকেই সাড়া—মাল্টিটাস্কার প্রার্থী ডা: অনুপ মন্ডল
এই মিশনের যে লোগো বা প্রতীক চিহ্নটি আমরা দেখি, সেটি স্বামীজি নিজের হাতে নকশা করেছিলেন। তাঁর এই ভাবনার প্রতিটি ছত্রে লুকিয়ে আছে আধ্যাত্মিকতার এক গভীর দর্শন। ছবির এই তরঙ্গায়িত জলরাশি হলো আমাদের নিরন্তর 'কর্মের' প্রতীক; ফুটে থাকা পদ্মফুলটি ভগবানের প্রতি অকৃত্রিম 'ভক্তির' কথা বলে; আর ওই উদীয়মান সূর্যটি হলো আমাদের অন্তরের শুদ্ধ 'জ্ঞানের' প্রকাশ। ছবিটিকে ঘিরে থাকা সর্পটি মানুষের সুপ্ত মানসিক শক্তি জাগরণের ইঙ্গিত দেয়, আর মাঝখানের রাজহংসটি হলো আমাদের 'পরমাত্মার' রূপ। এককথায় কর্ম, ভক্তি, জ্ঞান আর যোগের অপূর্ব সমন্বয়েই যে ঈশ্বর লাভ সম্ভব, এই প্রতীকের মাধ্যমে স্বামীজি সেই বার্তাই বিশ্ববাসীকে দিয়েছেন।
ধর্মীয় ঐক্য ও বৈদান্তিক আদর্শের বিশ্বব্যাপী প্রচারের পাশাপাশি অবহেলিত, অসহায় ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান ব্রত। বর্তমানে সারা বিশ্বে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ২১৪টিরও বেশি শাখাকেন্দ্র আছে। ভারত ও বাংলাদেশের পাশাপাশি আমেরিকা, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা ও ফ্রান্সের মতো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই মিশনের সেবাধর্ম ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানুষের হাহাকার, সেখানেই গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীরা পৌঁছে যান স্বামীজির সেই সেবার আদর্শ নিয়ে।
আজকের এই পুণ্য তিথিতে আমরা সেই মহান আদর্শকে প্রণাম জানাই, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। শতবর্ষ পেরিয়েও রামকৃষ্ণ মিশন আজও এক অম্লান আলোকস্তম্ভের মতো আমাদের পথ দেখাচ্ছে। মানুষের সেবার মধ্যেই যে প্রকৃত ঈশ্বর দর্শন সম্ভব, স্বামীজির সেই মন্ত্রই হোক আমাদের আগামীর অনুপ্রেরণা। এই সেবার জয়যাত্রা চলুক যুগ যুগ ধরে।
-জ্যোতি সরকার