২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে আজ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসমুদ্র থেকে কার্যত যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সভার শুরুতেই আমার প্রিয় পশ্চিমবঙ্গবাসী' বলে জনতাকে প্রণাম জানিয়ে আবেগঘন ভাষণ শুরু করেন তিনি। ব্রিগেডের উপচে পড়া ভিড় দেখে উচ্ছ্বসিত মোদী সাফ জানান, বাংলার প্রত্যেক কোণ থেকে আজ একটাই আওয়াজ উঠছে - "চাই বিজেপি সরকার"। তাঁর দাবি, বাংলায় পরিবর্তনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে এবং তৃণমূলের 'নির্মম সরকার' আর বেশিদিন ক্ষমতায় নেই।
প্রধানমন্ত্রী এদিন তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন যে, "বাংলার বর্তমান প্রশাসন সাধারণ মানুষকে চোর বলে গালি দিচ্ছে, কিন্তু আসল চোর কারা তা বাংলার তামাম মানুষ জানেন।" তিনি অভিযোগ করেন, আজকের সভায় আসা মানুষদের আটকাতে প্রশাসন গাড়ি থামিয়েছে, সেতু বন্ধ করেছে, কিন্তু তবুও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আটকানো যায়নি। মোদীর কথায়, কুর্সি বাঁচানোর জন্য এখানকার সরকার সব রকমের অগণতান্ত্রিক হাতিয়ার ব্যবহার করলেও মানুষের সংকল্পের কাছে তারা আজ পরাজিত।
আরও পড়ুন হরমুজের বাধা পেরিয়ে এলপিজি নিয়ে ভারতের পথে 'শিবালিক' ও 'নন্দাদেবী'
রাজ্যের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মোদী বলেন, তৃণমূল সরকার প্রকাশ্যে চাকরি বিক্রি করেছে। বাংলার মেধাবী যুবক-যুবতীরা ডিগ্রি পেয়েও আজ নিজের রাজ্যে কাজ পাচ্ছেন না, তাঁদের বাধ্য হয়ে ভিনরাজ্যে চলে যেতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, প্রথমে কংগ্রেস, তারপর বাম এবং এখন তৃণমূল, সবাই এসে নিজেদের পকেট ভরেছে কিন্তু উন্নয়ন থমকে রয়েছে। এই পরিস্থিতির বদল ঘটানোর জন্য তিনি 'মোদী গ্যারান্টি'-র প্রতিশ্রুতি দেন এবং জানান যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার যুবসমাজ নিজের রাজ্যেই কাজ পাবেন।
নারী নিরাপত্তা ও রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্দেশখালির সেই হাড়হিম করা ছবি আর আরজি কর কাণ্ডের বিভীষিকা বাংলার মানুষ ভোলেনি। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয় এবং এমনকি তৃণমূলের কার্যালয়গুলোতেও যৌন হেনস্থার মতো ঘটনা ঘটছে। মোদী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, অপরাধীদের একমাত্র জায়গা হবে জেল এবং বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার মা-বোনেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হবে।
কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়ে রাজ্য সরকারের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, কাটমানি না পেলে তৃণমূল সরকার কোনো প্রকল্প গ্রামে পৌঁছাতে দেয় না। আবাস যোজনা থেকে শুরু করে জলজীবন মিশন বা আয়ুষ্মান ভারত, প্রতিটি ক্ষেত্রেই কেন্দ্রের প্রকল্পের নাম বদলে দেওয়া হচ্ছে এবং প্রকৃত প্রাপকদের বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। এমনকি চা-বাগানের শ্রমিকদেরও কেন্দ্রীয় সুবিধা থেকে তৃণমূল বঞ্চিত রাখছে বলে তিনি অভিযোগ তোলেন।
ভাষণের শেষে প্রধানমন্ত্রী 'বাংলার নবনির্মাণ'-এর ডাক দেন। তিনি জানান যে, রাজ্যে বিজেপি সরকার না থাকলেও কেন্দ্র আজ পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব ভারতের উন্নয়নে ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের সড়ক, রেলপথ এবং বন্দর পরিকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেছে। মোদী বলেন, "আজ কলকাতার এই মাটি থেকে বাংলার উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায় লেখা হচ্ছে।" বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো খড়্গপুর-মোরগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, যা রাজ্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনবে। এছাড়াও কংসাবতী ও শিলাবতী নদীর ওপর বড় সেতু এবং দুবরাজপুর বাইপাসের মতো প্রকল্পগুলো যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, বিজেপি সরকার গঠন হলে প্রতিটি গরিব মানুষ পাকা বাড়ি পাবেন এবং ঘরে ঘরে পরিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছাবে। তবে উন্নয়নের বার্তার পাশাপাশি মোদীর কণ্ঠে ছিল চরম হুঁশিয়ারিও। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আইন ভঙ্গকারীদের খুঁজে বের করা হবে এবং সব দুর্নীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই উন্নয়নমুখী অথচ চরম আক্রমণাত্মক মেজাজ আগামী নির্বাচনে বাংলার রাজনীতিতে যে এক নতুন মাত্রা যোগ করল, তা বলাই বাহুল্য।
-দিশা দাস