সপ্তাহের শেষ লগ্নে জোড়া বিক্ষোভে কার্যত উত্তাল হয়ে উঠল তিলোত্তমার রাজপথ। একদিকে রাজ্যের স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘দুর্নীতিমুক্ত’ করার দাবিতে SFI-এর বিকাশ ভবন অভিযান, অন্যদিকে সেবকের মংপুতে এক সহকর্মীর আত্মঘাতী হওয়ার বিচার চেয়ে নির্বাচন কমিশনের (CEO Office) সামনে BLO ঐক্য মঞ্চের প্রতিবাদ। সব মিলিয়ে উত্তর থেকে বিধাননগর, কলকাতার দুই প্রান্তেই দিনভর চলল পুলিশি ধস্তাধস্তি ও তীব্র উত্তেজনা।
শুক্রবার দুপুরের SFI-এর উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটির পক্ষ থেকে করুণাময়ী থেকে বিকাশ ভবন অভিযানের ডাক দেওয়া হয়। মিছিলটি বিকাশ ভবনের প্রবেশপথের কাছাকাছি পৌঁছাতেই পুলিশের তৈরি করা ত্রিস্তরীয় ব্যারিকেডের মুখে পড়ে। আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে শুরু হয় তুমুল ধস্তাধস্তি। পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যেই খণ্ডযুদ্ধের চেহারা নেয়। পুলিশের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জের অভিযোগ তুলেছে বাম ছাত্র সংগঠন। এই সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন ছাত্রকর্মী আহত হয়েছেন এবং পুলিশ অনেককে আটক করে নিয়ে যায়। এসএফআই নেতৃত্বের অভিযোগ, রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোতে বছরের পর বছর হাজার হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। অথচ নিয়োগ দুর্নীতির কালো ছায়ায় যোগ্য প্রার্থীরা আজও রাস্তায় বসে দিন কাটাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে গণহারে চাকরি বাতিলের ফলে শিক্ষাব্যবস্থা আজ ধ্বংসের মুখে। অবিলম্বে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু না হলে এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ না করা হলে আগামী দিনে এই আন্দোলন নবান্ন পর্যন্ত পৌঁছাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ছাত্র নেতারা।
আরও পড়ুন অর্জুন সিংয়ের 'সামাজিক বয়কট' নিদান! ব্যারাকপুরে বিজেপি-তৃণমূল চরম সংঘাত
অন্যদিকে, ডালহৌসি চত্বরে সিইও দফতরের সামনেও ছিল উপচে পড়া ক্ষোভ। সম্প্রতি সেবকের করোনেশন ব্রিজ সংলগ্ন তিস্তা নদী থেকে শিলিগুড়ির বিএলও শ্রবণ কুমার কাহারের নিথর দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) অত্যধিক কাজের চাপ এবং ওপরতলার আধিকারিকদের মানসিক হেনস্থার জেরেই তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং বিএলও-দের ওপর থেকে ‘অমানবিক কাজের চাপ’ কমানোর দাবিতে এদিন নির্বাচন কমিশনের দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখায় বিএলও ঐক্য মঞ্চ। এই নিয়ে রাজ্যে ভোটার তালিকার কাজ চলাকালীন অন্তত ১০ জন বিএলও-র মৃত্যু বা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটল বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। CEO দফতরের সামনে বিক্ষোভকারীদের হঠাতে পুলিশকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। এদিনের এই আন্দোলনে BLO ঐক্য মঞ্চের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, অবিলম্বে মৃত BLO-র পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং কাজের সময়সীমা ও পদ্ধতি মানবিক করতে হবে। দাবি মানা না হলে রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকার কাজ বয়কটের পথে হাঁটারও প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন তাঁরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এই জোড়া আন্দোলনের জেরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও শহরের দুই প্রান্তেই রাজনৈতিক উত্তাপ কমেনি। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে সরকারি কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, সব মিলিয়ে এদিনধুন্ধুমার অবস্থা সাক্ষী ছিল কলকাতার রাজপথ ছিল। এর ফলে করুণাময়ী চত্বর এবং মধ্য কলকাতার একাংশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। একদিকে অফিস ছুটির ব্যস্ততা, অন্যদিকে মিছিলের জেরে দীর্ঘক্ষণ বাস ও অন্যান্য যানবাহন আটকে থাকে। পুলিশি তৎপরতায় বিকেল গড়াতে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সাধারণ মানুষকে দীর্ঘক্ষণ চরম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনেই ভোট, তাই নিয়োগ দুর্নীতি এবং BLO-দের এই মৃত্যু ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন, উভয়কেই কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাতে চাইছে বিরোধী দল ও বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠনগুলি।
-দিশা দাস