দক্ষিণ কলকাতার আনন্দপুরের নাজিরাবাদে গত রবিবারের বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড পশ্চিমবঙ্গের শিল্প নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবকে আবারও প্রকট করে তুলেছে। ওয়াও মোমো এবং ডেকরেটরসের গুদামে লাগা এই আগুন কেবল প্রাণহানিই ঘটায়নি, বরং রাজ্যের শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। স্বজনহারাদের আর্তনাদ আর পোড়া গন্ধের মাঝেই এখন নাজিরাবাদ হয়ে উঠেছে সংবাদের কেন্দ্রবিন্দু।
গত রবিবার মধ্যরাতে নাজিরাবাদের ওই গুদামগুলোতে আগুন লাগে। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ১১ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হলেও, নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে ২৭ জনের নামে। উদ্ধারকাজ চলাকালীন ২১টি দেহাংশ উদ্ধার হওয়ায় মৃতের সংখ্যা ৪০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিরোধী দলনেতা। দমকলের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘিঞ্জি এলাকায় জলাভূমি বুজিয়ে তৈরি করা ওই গুদামগুলোতে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না, যা এই ট্র্যাজেডিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
আরও পড়ুন তৃণমূলকে ভোট না দিলে জুটবে না ঘর? ভাঙড়ে শওকত মোল্লার মন্তব্য ঘিরে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি
বৃহস্পতিবার দুপুরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি বিধায়কদের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পুলিশি তদন্তের সুবিধার্থে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেখানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছিল। পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু জানান যে তিনি আইন মান্যকারী বিধায়ক, তাই ১০০ মিটার দূর থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। তবে তিনি অভিযোগ করেন, শাসকদলের মন্ত্রীরা অনায়াসে ঘুরতে পারলেও বিরোধীদের আটকানোর জন্যই রাতারাতি এই আইনি কড়াকড়ি করা হয়েছে। ভষ্মীভূত এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপি বিধায়কেরা নিখোঁজ ও স্বজনহারা পরিবারগুলোর সাথে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন। শোকাতপ্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁদের কথা শোনেন এবং সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। নিখোঁজদের সন্ধানে প্রশাসনের ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি অসহায় পরিবারগুলোকে আইনি ও সামাজিক লড়াইয়ে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেন।
ঘটনাস্থল থেকে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি এখান থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনি তিন দিন পরেও পরিদর্শনে এলেন না। শুভেন্দুর দাবি, মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা বেআইনি ভাড়া এবং দুর্নীতির কারণেই এই বিপজ্জনক গুদামগুলো চলছিল। তিনি এই ঘটনার দায়ভার প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে মৃতদের পরিবারপিছু ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং একজনের চাকরির দাবি জানিয়েছেন। বিজেপি-র প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ অনুমতি না দিলেও কলকাতা হাইকোর্ট শেষ পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে সবুজ সংকেত দিয়েছে। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের নির্দেশ অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ১১:৩০ থেকে দুপুর ৩:৩০ পর্যন্ত নির্দিষ্ট রুট মেনে (শীতলা মন্দির থেকে নরেন্দ্রপুর থানা) মিছিল করা যাবে। মিছিলে সর্বোচ্চ ২০০০ জন সমর্থক অংশ নিতে পারবেন। এই নির্দেশের পরেই শুভেন্দু অধিকারী আগামীকাল বিশাল 'থানা চলো' অভিযানের ডাক দিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, আনন্দপুরের এই ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি প্রশাসনিক গাফিলতি ও বেআইনি নির্মাণের এক চরম পরিণতি। একদিকে যখন নিখোঁজদের পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপের সামনে প্রিয়জনের অপেক্ষায় দিন গুনছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো দোষারোপের খেলায় মত্ত। এখন দেখার বিষয়, উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর প্রকৃত সত্য কী বেরিয়ে আসে এবং দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পায় কি না।
-জ্যোতি সরকার