বিপ্লবের পরের বাংলাদেশে যখন এক নতুন ভোরের স্বপ্ন নিয়ে সাধারণ মানুষ বুক বেঁধেছিল, ঠিক তখনই রাজনীতির আকাশে জমতে শুরু করেছে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের মেঘ। ২০২৪ সালের সেই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর সবাই ভেবেছিল দেশ এক নতুন দিকে যাবে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে সেই স্বপ্ন যেন কোথাও বাধা পাচ্ছে। বর্তমানে নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে, তা এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে এখন বড় প্রশ্ন, দেশ কি তবে পিছিয়ে যাচ্ছে?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে গত ২০২৪ সালের বিপ্লবের পর থেকে নারী, শিশু এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান বলছে, নারীদের ওপর সহিংসতার হার আগের বছরের তুলনায় বহুগুণ বেশি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীর উসকানিমূলক বক্তব্য এবং নারীদের সামাজিক চলাফেরা বন্ধ করার পরিকল্পিত চেষ্টার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন ভারতকে হারানোই কি বাংলাদেশের আসল প্রাপ্তি? মিরাজের মন্তব্যে তোলপাড় ক্রিকেট মহল, বিপাকে বিসিবি
মানবাধিকার পরিস্থিতির এই অবনতি কেবল নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী মানুষেরাও আজ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। গত বছরের শেষ দিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নিহত শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসের নির্মম হত্যাকাণ্ড এর একটি বড় উদাহরণ। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চলা একের পর এক হামলার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, বর্তমান সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় আদিবাসীদের ওপর নিরবচ্ছিন্ন নিপীড়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া তালিকাভুক্ত ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলেই কোনো নারী প্রার্থী রাখা হয়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে দুজন নারী প্রধানমন্ত্রীর সফলতার ইতিহাস থাকলেও, বর্তমানের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের মনোনয়ন দেয়নি। বিশেষ করে জামায়াত-ই-ইসলামীর মতো দলগুলো একজন নারীকেও প্রার্থী হিসেবে নামায়নি, যা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীদের অধিকার হরণের এক স্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
সবমিলিয়ে বলা যায়, গণতান্ত্রিক এই অগ্রযাত্রায় নারীদের বাদ রেখে কি আদৌ কোনো উন্নতি সম্ভব? হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আজ স্পষ্ট ভাষায় সরকারকে নারী সংস্কার কমিশনের কথা শোনার এবং জাতিসংঘের নিয়ম মেনে সংখ্যালঘু ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী নির্বাচন কি সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করবে, নাকি দেশ আবারও কোনো বড় সংকটের মুখে পড়বে। আন্তর্জাতিক মহল এখন তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
-জ্যোতি সরকার