কলকাতার ব্যস্ত রাজপথে যখন নতুন বছরের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে, ঠিক তখনই বাংলার রাজনীতির অলিন্দে এক গভীর রহস্যের জাল বোনা শুরু হয়েছে। কোনো প্রকাশ্য জনসভা নেই বা কোনো মাইকের গর্জন নেই, অথচ দিল্লির চাণক্য হিসেবে পরিচিত অমিত শাহ হঠাৎ কেন তিলোত্তমায় এসে টানা তিন দিন একান্তে একের পর এক বৈঠক করছেন, তা নিয়ে এখন জল্পনা তুঙ্গে। হোটেলের সেই কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা ঘরের ভেতরে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ঠিক কী নীল নকশা তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্ন যখন সবার মনে, তখনই মঙ্গলবার দুপুরে দীর্ঘ এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসে সব রহস্যের পর্দা সরালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাংবাদিক বৈঠকে বসেই তিনি সরাসরি আক্রমণ করলেন রাজ্য সরকারের দিকে এবং স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলেন যে, আগামী নির্বাচনে 'অনুপ্রবেশই' হতে চলেছে বিজেপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র। শাহ অত্যন্ত কড়া সুরে অভিযোগ তুললেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার শুধু অনুপ্রবেশে বাধাই দিচ্ছে না, বরং অনুপ্রবেশকারীদের লালন-পালন করছে। তিনি সাফ জানালেন যে, ২০২৬ সালে বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের প্রথম কাজ হবে পশ্চিমবঙ্গকে অনুপ্রবেশকারী মুক্ত করা এবং যারা ইতিমধ্যেই ঢুকে পড়েছে তাদেরও দেশ থেকে তাড়ানো হবে। তিনি প্রশ্ন তুললেন, দেশের অন্য কোনো রাজ্য কি আছে যারা আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে বাধা দেয়? এই সমস্যা এখন আর শুধু বাংলার নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য এক বড়সড় হুমকি।
অনুপ্রবেশের পাশাপাশি তিনি রাজ্যের নারী নিরাপত্তা এবং পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি নিয়ে অত্যন্ত ঝাঁঝালো ভাষায় শাসক দলকে আক্রমণ করেন। আরজি কর থেকে শুরু করে সন্দেশখালি বা দক্ষিণ কলকাতা ল কলেজের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কোন জমানায় বাস করছি যে সন্ধ্যা সাতটার পর মেয়েদের ঘরের বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে?’ দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন, চিটফান্ড থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি বা গরু ও কয়লা পাচার—সব জায়গাতেই তৃণমূল নেতাদের নাম জড়িয়ে আছে এবং বাংলার শিল্পের হাল এখন অত্যন্ত শোচনীয়।
আরও পড়ুন মরসুমের শীতলতম দিন আজ! কলকাতায় পারদ নামল ১২.৬ ডিগ্রিতে, হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বড় ঘোষণা আবহাওয়া দপ্তরের!
অমিত শাহ আত্মবিশ্বাসী মেজাজে মতুয়া এবং শরণার্থীদের উদ্দেশ্যে বড় বার্তা দিয়ে স্পষ্ট করে দিলেন যে, শরণার্থীরা ভারতেরই নাগরিক এবং তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া বিজেপির একটি পবিত্র প্রতিশ্রুতি। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইলেও তাঁদের কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না। গত কয়েকটি নির্বাচনের পরিসংখ্যান এবং দলের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি দাবি করেন যে, ২০২৬ সালে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলায় পদ্ম শিবিরই সরকার গড়তে চলেছে।
অবশেষে পৌনে এক ঘণ্টার এই টানটান সাংবাদিক সম্মেলন শেষে যখন অমিত শাহ আসন ছেড়ে উঠলেন, তখন তিনি রেখে গেলেন এক প্রবল রাজনৈতিক অস্থিরতা। তিনি পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন যে, ২০২৬-এর যুদ্ধের দামামা তিনি আজ থেকেই বাজিয়ে দিলেন এবং এবারের লড়াই হবে মূলত অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি আর নারী নিরাপত্তার বিরুদ্ধে। পর্দার আড়ালে চলা সেই সব গোপন বৈঠকের মূল বার্তা যখন এভাবেই প্রকাশ্যে এল, তখন শাহের এই সফরের পর বাংলার রাজনীতির জল কোন দিকে গড়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
- জ্যোতি সরকার