বাংলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সামান্য পান থেকে চুন খসলেই দিল্লি থেকে শুরু করে গোটা দেশের সংবাদমাধ্যম সাজ সাজ রব তোলে। বঙ্গে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেই, গণতন্ত্র বিপন্ন বলে চিৎকার বা কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল পাঠানোর যে তৎপরতা দেখা যায়, ঠিক পাশের রাজ্য ওড়িশার ক্ষেত্রে তা যেন উধাও। অথচ সেখানে এখন কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের ডবল ইঞ্জিন সরকার ক্ষমতাসীন।
মালকানগিরির ঘটনা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতে শাসকের রং কীভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় এবং জাতীয় স্তরের সমালোচকরা কীভাবে রাজ্যভেদে মুখে কুলুপ আঁটেন।
গত কয়েকদিন ধরে মালকানগিরি কার্যত অগ্নিগর্ভ। এক আদিবাসী মহিলার মুণ্ডুহীন দেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে যে বর্বরোচিত হিংসার সাক্ষী থাকল ওড়িশা, তা শিহরণ জাগানোর মতো। তদন্তে নেমে বুধবার পুলিশ ওই মহিলার কাটা মুণ্ডু উদ্ধার করেছে ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন অস্বাভাবিক ভাড়া! ইন্ডিগো সঙ্কটে দিল্লি হাই কোর্টের তির কেন্দ্রের দিকে
ক্ষিপ্ত জনতা সন্দেহের বশে বেছে বেছে বাঙালি অধ্যুষিত এমভি-২৬ (MV-26) গ্রামে হামলা চালিয়ে প্রায় ২০০টি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, ঘরছাড়া হয়েছেন বহু মানুষ। প্রশ্ন উঠছে, যখন দিনের আলোয় একের পর এক বাঙালির ঘরবাড়ি জ্বলছিল, তখন সুশাসন-এর দাবি করা প্রশাসন ও পুলিশবাহিনী কোথায় ছিল? কেন আগেভাগে এই উত্তেজনার আঁচ পাওয়া গেল না?
রাজনৈতিক মহলের একাংশ হামেশাই দাবি করেন, ডবল ইঞ্জিন সরকার মানেই নাকি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের জোয়ার। কিন্তু মালকানগিরির এই ভয়াবহ চিত্র সেই দাবিকে কার্যত ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে উন্মত্ত জনতা। যেখানে পশ্চিমবঙ্গের ছোটখাটো ঘটনাতেও 'রাষ্ট্রপতির শাসন'-এর দাবি ওঠে, সেখানে ওড়িশার মতো রাজ্যে এত বড় মাপের হিংসাত্মক ঘটনার পরেও জাতীয় স্তরে সেই ঝাঁঝালো সমালোচনার অভাব সত্যিই বিস্ময়কর।
এই নীরবতাই প্রমাণ করে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ যতটা না বাস্তবিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভীনরাজ্যে বারবার বাঙালিরাই আক্রমণের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। মালকানগিরিতে যারা সর্বস্ব হারিয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিলেন, তাঁরাও বাঙালি। অথচ তাঁদের নিরাপত্তা দিতে চরম ব্যর্থ সেখানকার ব্যবস্থা।
বলাই যায়, এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, অপরাধ বা প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে যখন রাজনৈতিক চশমা দিয়ে দেখা হয়, তখন বিচার আর সুরক্ষা গৌণ হয়ে যায়। বাংলার দিকে আঙুল তোলার আগে ওড়িশার প্রশাসনিক ব্যর্থতার এই দগদগে ক্ষতের দিকে তাকানো তাই আজ সময়ের দাবি।
-দিশা দাস