বিহার বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে এনডিএ জোট। বিজেপি এবং নীতীশ কুমারের জেডি(ইউ)-এর সামনে কার্যত দাঁড়াতেই পারেনি গতবারের প্রধান বিরোধী দল আরজেডি-নেতৃত্বাধীন মহাগঠবন্ধন। এই ফল প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের ঠিক আগে 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' (Special Intensive Revision - SIR) কি তবে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি?
গত ২৪ জুন থেকে শুরু হয়ে প্রায় তিন মাস ধরে বিহারে চলেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল মৃত এবং ভুয়ো ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। প্রথমে খসড়া তালিকা প্রকাশ হলে দেখা যায়, মোট ভোটারের সংখ্যা ৭ কোটি ৮৯ লক্ষ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ২৪ লক্ষ, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল। পরবর্তীতে আরও কিছু নাম বাদ দেওয়া হয় (৩.৬৬ লক্ষ), কিন্তু পাশাপাশি ২১.৫৩ লক্ষ নতুন ভোটারের নামও যোগ করা হয়। ফলস্বরূপ, চূড়ান্ত তালিকায় ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ কোটি ৪২ লক্ষ। সামগ্রিকভাবে, মৃত ও ভুয়ো ভোটার মিলে তালিকা থেকে মোট ৪৭ লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল।
আরও পড়ুন বিহার জয়ের পর বিজেপির নিশানায় বাংলা, পাল্টা জবাবে কুণাল ঘোষ
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, যে ১০৬টি বিধানসভা কেন্দ্রে SIR-এর কারণে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছিল, তার অধিকাংশ আসনেই জয়ী হয়েছে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। মহাগঠবন্ধন জয় পেয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি আসনে। 'এসআইআর প্রভাবিত' এই ১০৬টি কেন্দ্রের ফলাফলে স্পষ্ট যে, বিরোধী দলগুলি SIR-এর মাধ্যমে 'বৈধ' ভোটারদের বাদ দেওয়ার যে অভিযোগ তুলেছিল, তা ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। পটনা, মধুবনি এবং পূর্ব চম্পারণ জেলার মতো যে স্থানগুলি বাতিলের তালিকায় শীর্ষে ছিল, সেখানেও এনডিএ-র সাফল্য চোখে পড়ার মতো।
বিরোধী দলগুলি প্রথম থেকেই এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সরব ছিল। তারা এটিকে 'ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত' এবং 'নির্বাচনী ষড়যন্ত্র' বলে উল্লেখ করে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বিহারে ১৬ দিনের জন্য ১৩০০ কিলোমিটারের 'ভোটার অধিকার যাত্রা' কর্মসূচি নিয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে কমিশন বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে 'ভোটচুরির' খেলায় নেমেছে। এনডিএ-র জয়ের পর বিরোধী জোট এখন এই পরিসংখ্যানকেই 'অজুহাত' হিসাবে তুলে ধরছে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব SIR-কে 'নির্বাচনী ষড়যন্ত্র' বলে উল্লেখ করে বলেছেন, "বিহারে এসআইআর দিয়ে বিজেপি যে গেম খেলেছে, অন্য কোথাও তা করতে পারবে না। কারণ, ওদের ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গিয়েছে।"
বিহারের পর ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, অসম, কেরল এবং পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন বাকি রাজ্যগুলিতেও SIR সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই SIR প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আগামী ৯ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারির পর।
বিহারের ফলাফলের পর এখন প্রশ্ন হল, বিরোধী-শাসিত রাজ্য যেমন- পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, বা কেরলে কি SIR প্রক্রিয়া 'নিষ্ক্রিয়' থাকবে, নাকি তা 'খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার' হয়ে উঠবে?
-অঙ্কিতা পাল